ফরজ নামাজ না পড়ার শাস্তি

দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ। আল্লাহর ওপর ঈমান আনার পর সর্বপ্রথম আমল হলো ফরজ নামাজ। এটি মুসলমান ও কাফেরের মধ্যে পার্থক্যকারী বাহ্যিক মাধ্যমগুলোর একটি হলো নামাজ পরিত্যাগকারিকে কাফেরের সমতুল্য বলা হয়েছে। তাই আজ আমরা ফরজ নামাজ না পড়ার শাস্তি নিয়ে কথা বলবো ইনশাআল্লাহ।
দুঃখজনক হলেও সত্য, নামাজ ত্যাগের মতো ভয়াবহ গুনাহে বর্তমানে অসংখ্য মুসলমান লিপ্ত। প্রতিনিয়ত নামাজ ত্যাগের গুনাহ করতে করতে এমন স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেন এখন আর এটাকে সেভাবে গুনাহের কাজ মনে হয় না। আল্লাহর রাসুল (সা.) এর দৃষ্টিতে নামাজ ত্যাগকারী দুনিয়াতে অভিশপ্ত আর আখিরাতে কঠিন শাস্তির যোগ্য। হাশরের মাঠে কঠিন পরিস্থিতিতে সর্বপ্রথম বান্দার নামাজের হিসাব নেওয়া হবে।

নামাজের বিধান মুসলমানের ওপর এতটাই কঠিন যে, যুদ্ধের ময়দানে নামাজ ছাড়ার কোন সুযোগ নেই। প্রয়োজনে মুসল্লিরা দুভাগ হয়ে এক দল নামাজ পড়বে আর অন্য দল যুদ্ধ করবে। এভাবে পালাবদল করে নামাজ শেষ করবে। বার্ধক্যের শেষ মুহূর্তে শয্যাশায়ী অবস্থায়ও শুয়ে শুয়ে ইশারায় নামাজ পড়বে। পড়তে না পারলে উত্তরসূরিদের নামাজের ক্ষতিপূরণের অসিয়ত করে যাবে। কোনো ব্যক্তি যদি নামাজ অস্বীকার করে, তাহলে সে কাফের হিসাবে গণ্য হবে। আর যদি কোনো ব্যক্তি নামাজকে স্বীকার করার পর তা অস্বীকার করে তাহলে সে ফাসেক বলে গণ্য হবে। কাফের ও ফাসেক উভয়ের শাস্তি হলো জাহান্নাম। যদিও ফাসেক ব্যক্তি শাস্তি শেষে জান্নাতে প্রবেশ করার সুযোগ পাবে।
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আল্লাহ তাআলা ফরজ করেছেন। একজন মুমিন যেখানেই অথবা যে অবস্থাতেই থাকুক না কেনো? নামাজ অবশ্যই আদায় করতে হয়। কেউ অসুস্থ হলে কিংবা যানবাহনে থাকলে, তার নামাজেরও পদ্ধতি আছে।

অন্যান্য নবীদের যুগেও নামাজের বিধান ছিল। তবে পদ্ধতিগতভাবে পার্থক্য ছিল। কিন্তু তাদের পরবর্তীতে তাদের উম্মতের লোকেরা নামাজের ব্যাপারে অবহেলা শুরু করে। অথচ ফরজ নামাজ না পড়ার করা ভয়াবহ গোনাহের কাজ। আর এর কঠিন পরিণতি হলো- জাহান্নাম।

ফরজ নামাজ না পড়লে কেমন শাস্তি হতে পারে


নামাজ না পড়লে কেমন শাস্তি হতে পারে তার কিছুটা অনুমান করা যায় একটি হাদিসে।
আল্লাহর রাসুল (সা.) সকালে ফজরের নামাজের পর সাহাবিদের নিয়ে রাতের স্বপ্ন নিয়ে কথা বলতেন। কোনো সাহাবি স্বপ্ন দেখলে সেটা বলতেন। আল্লাহর রাসুলও (সা.) রাতে বিশেষ স্বপ্ন দেখলে সাহাবিদের বলতেন।

এক দিন সকালে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আজ রাতে আমার কাছে দুজন ব্যক্তি এসেছিল, আর তারা আমাকে বলল, আমাদের সঙ্গে চলুন। আমি তাদের সঙ্গে চললাম। অতপর আমরা এমন এক লোকের কাছে পৌঁছলাম, যে চিত হয়ে শুয়েছিল। অপর এক ব্যক্তি পাথর হাতে নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে পাথর দিয়ে শুয়ে থাকা ব্যক্তির মাথায় আঘাত করছে এবং থেঁতলে দিচ্ছে। যখন সে পাথর নিক্ষেপ করছে তা গড়িয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। লোকটি গিয়ে পাথরটি পুনরায় তুলে নিচ্ছে এবং তা নিয়ে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই লোকটির মাথা পুনরায় পূর্বের মতো ভালো হয়ে যাচ্ছে। সে আবার লোকটির কাছে ফিরে আসছে এবং তাকে পূর্বের মতো শাস্তি দিচ্ছে। আমি আমার সঙ্গী দুজনকে জিজ্ঞাস করলাম- সুবহানাল্লাহ! এরা কারা? তখন তারা জবাবে বললেন, এ ব্যক্তি ফরজ নামাজ না পড়েই ঘুমিয়ে যেত।’(রিয়াদুস সালেহিন : ১৫৪৬)

ফরজ নামাজ না পড়লে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কবরেই আজাব শুরু হয়ে যায়


বেনামাজির কবরে আজাবের ফেরেশতা নিযুক্ত করা হবে। তার হাতে লোহার হাতুড়ি থাকবে। সে মৃত ব্যক্তিকে বলতে থাকবে, দুনিয়ায় কেন নামাজ পড়নি? আজ তার আজাব ভোগ করো। এই বলে ফজর নামাজ না পড়ার কারণে ফজর হতে জোহর পর্যন্ত, জোহর নামাজের কারণে জোহর থেকে আছর পর্যন্ত, আছর নামাজের কারণে আছর থেকে মাগরিব পর্যন্ত, মাগরিবের নামাজের কারণে মাগরিব থেকে এশা পর্যন্ত এবং এশার নামাজের কারণে এশা থেকে ফজর পর্যন্ত লোহার হাতুড় দ্বারা আঘাত করতে থাকবে। প্রত্যেকবার আঘাতের সময় বজ্রপাতের ন্যায় শব্দ হবে এবং শরীর চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ৫০ গজ মাটির নিচে চলে যাবে। সেই ফেরেশতা পুনরায় তাকে জীবিত করে হাড়-মাংস এক করে আবার আঘাত করবে এভাবেই আঘাত করতে থাকবে। এভাবে কেয়ামত পর্যন্ত লোহার হাতুড়ি দিয়ে তাকে আঘাত করতে থাকবে। আর কবর অসংখ্য সাপ-বিচ্ছু দ্বারা পরিপূর্ণ থাকব
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন,

فَاِذَا قَضَیۡتُمُ الصَّلٰوۃَ فَاذۡکُرُوا اللّٰهَ قِیٰمًا وَّ قُعُوۡدًا وَّ عَلٰی جُنُوۡبِکُمۡ ۚ فَاِذَا اطۡمَاۡنَنۡتُمۡ فَاَقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ ۚ اِنَّ الصَّلٰوۃَ کَانَتۡ عَلَی الۡمُؤۡمِنِیۡنَ کِتٰبًا مَّوۡقُوۡتًا. ۱۰۳

অতপর যখন তোমরা সালাত পূর্ণ করবে তখন দাঁড়ানো, বসা, শোয়া অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করো। অতপর যখন নিশ্চিন্ত হবে তখন সালাত কায়েম করবে। নিশ্চয় সালাত মুমিনদের উপর নির্রাধিরত সময়ে ফরয। (সুরা : নিসা : ১০৩)

ফরজ নামাজ না পড়ার কঠিন শাস্তির বিধান

مَا سَلَکَکُمۡ فِیۡ سَقَرَ ۴۲ قَالُوۡا لَمۡ نَکُ مِنَ الۡمُصَلِّیۡنَ ۴۳


কিসে তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করাল? তারা বলবে, ‘আমরা সালাত আদায়কারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। (সুরা : মুদ্দাসসির : ৪২-৪৩)

ফরজ নামাজ না পড়ায় জাহান্নামে কঠিন শাস্তি


নামায তরক করা ব্যক্তি কিয়ামতের দিন জাহান্নামের কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ করা হবে।
নূহ, ইবরাহিম, ইসরাঈল (আ.)-এর ব্যাপারে বর্ণনা করার পরে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَخَلَفَ مِنۡۢ بَعۡدِهِمۡ خَلۡفٌ اَضَاعُوا الصَّلٰوۃَ وَ اتَّبَعُوا الشَّهَوٰتِ فَسَوۡفَ یَلۡقَوۡنَ غَیًّا ۵۹

তাদের পরে এমন এক অসৎ বংশধর আসল যারা সালাত বিনষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করল। সুতরাং শীঘ্রই তারা জাহান্নামের আজাব প্রত্যক্ষ করবে। (সুরা : মারইয়াম : ৫৯)

ফরজ নামাজ না পড়ার কঠোর হুঁশিয়ারি


শুধু পরকালীন শাস্তি নয়, নামাজ না পড়লে ইহকালীন জীবনও বরকতশূন্য হয়ে যায়। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তির আসরের সালাত কাজা হয় তার পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ সবই যেন ধ্বংস হয়ে গেল। (মুসলিম : ১৩০৪)

ফরজ নামাজ না পড়লে কিয়ামতের দিন লাঞ্চনাকর শাস্তি


কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বেনামাজী অপদস্থতা ও লাঞ্ছনার শিকার হবে, কুরআনের একটি আয়াতে তার বিবরণ এসেছে :-

یَوۡمَ یُکۡشَفُ عَنۡ سَاقٍ وَّ یُدۡعَوۡنَ اِلَی السُّجُوۡدِ فَلَا یَسۡتَطِیۡعُوۡنَ ۴۲ خَاشِعَۃً اَبۡصَارُهُمۡ تَرۡهَقُهُمۡ ذِلَّۃٌ ؕ وَ قَدۡ کَانُوۡا یُدۡعَوۡنَ اِلَی السُّجُوۡدِ وَ هُمۡ سٰلِمُوۡنَ ۴۳

সে দিন পায়ের গোছা উন্মোচন করা হবে। আর তাদেরকে সিজদা করার জন্য আহবান জানানো হবে, কিন্তু তারা সক্ষম হবে না। তাদের দৃষ্টিসমূহ অবনত অবস্থায় থাকবে, অপমান তাদেরকে আচ্ছন্ন করবে। অথচ তাদেরকে তো নিরাপদ অবস্থায় সিজদা করার জন্য আহবান করা হত (তখন তো তারা সিজদা করেনি)। (সুরা : কালাম : ৪২-৪৩)

যে নামাজ পড়ে না তার ঈমান খুুবই দুর্বল। ইসলামে তার হিস্যা খুব সামান্যই। নামাজ না পড়াকে মহানবী (সা.) কুফরি কাজ ও কাফিরের স্বভাব বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। এক হাদিসে এসেছে, যার ভেতর নামাজ নেই, তার ভেতর দ্বিনের কোনো হিস্যা নেই।(মুসনাদে বাজ্জার : ৮৫৩৯)

নামাজ পরকালে মুক্তির উপায়


নামাজ পড়া কতই বড় সৌভাগ্যের বিষয়! আর নামাজ না পড়া কতই না বড় দুর্ভাগ্যের বিষয়! রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, কিয়ামতের দিন এ নামাজ তার জন্য আলো ছড়াবে। তার ঈমান ও ইসলামের দলিল হবে এবং তার নাজাতের মাধ্যম হবে। আর যে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়মিত নামাজ না পড়ে , কিয়ামতের বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে নামাজ তার জন্য আলো ছড়াকে না। দলিলও হবে না এবং সে আজাব থেকে রেহাইও পাবে না। (মুসনাদে আহমাদ : ৬৫৭৬)

আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَخَلَفَ مِنۡۢ بَعۡدِهِمۡ خَلۡفٌ اَضَاعُوا الصَّلٰوۃَ وَ اتَّبَعُوا الشَّهَوٰتِ فَسَوۡفَ یَلۡقَوۡنَ غَیًّا ۵۹ اِلَّا مَنۡ تَابَ وَ اٰمَنَ وَ عَمِلَ صَالِحًا فَاُولٰٓئِکَ یَدۡخُلُوۡنَ الۡجَنَّۃَ وَ لَا یُظۡلَمُوۡنَ شَیۡئًا۶۰

তাদের পর আসল এক অসৎ বংশধর, যারা সালাত বিনষ্ট করলো ও কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করলো। সুতরাং অতি তারাতারই তারা জাহান্নামের আজাব দেখতে পাবে, তবে তারা ব্যতিত যারা তওবা করেছে, ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবেন এবং তাদের প্রতি কোনো যুলুম করা হবে না। (সুরা মারইয়াম : ৫৯-৬০)

ফরজ নামাজ ছেড়ে দেওয়া কাফের হওয়ার মতো

আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কোনো ব্যক্তি এবং কুফর ও শিরকের মধ্যে ব্যবধান শুধু নামাজ না পড়া। যে নামাজ ছেড়ে দিল সে কাফের হয়ে গেল (কাফেরের মতো কাজ করল)।’ (সহিহ মুসলিম : ৮২)

অন্য হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমাদের ও কাফেরদের মধ্যে ব্যবধান শুধু নামাজের। যে নামাজ ত্যাগ করল সে কাফের হয়ে গেল।’ (তিরমিজি : ২৬২১)

নামাজ পড়া মুসলিমদের একটি বাহ্যিক নিদর্শন। ঈমানের পর ইসলামের সবচেয়ে বড় হুকুম। আর নামাজ ছেড়ে দিলে— মুসলিমের থেকে ইসলামের বড় কিছু ছুটে যায়। তাই উমর (রা.) বলতেন, নামাজ ত্যাগকারী কাফের। (বায়হাকি : ১৫৫৯, ৬২৯১)
এছাড়াও ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলি (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি নামাজ পড়ে না সে কাফের। (বায়হাকি : ৬২৯১)

আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি নামাজ পড়ে না সে মুসলমানের অন্তরভোক্ত নয়। (বায়হাকি : ৬২৯১)

তারা প্রত্যেকে নামাজ না পড়ার ব্যাপারে কঠোর হুঁশিয়ারি উল্লেখ করেছেন। তারা বলতে চেয়েছেন যে, নামাজ পরিত্যাগ করা কাফেরদের কাজ। যে মুসলমান নামাজ পড়ল না— সে যেন কাফেরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ কাজ করল।

আল্লাহর জিম্মাদারি বেরিয়ে যাওয়া ও সবকিছু হারানো

ইচ্ছাকৃত ফরজ নামাজ ছেড়ে দিলে মহান আল্লাহ ওই ব্যক্তির ওপর থেকে তার জিম্মাদারি তুলে নেয়। মুআজ (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) আমাকে দশটি নসিহত করেছিলেন, তার মধ্যে বিশেষ একটি এটাও যে তুমি ইচ্ছাকৃত ফরজ নামাজ ত্যাগ করো না। কারণ, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত ফরজ নামাজ ছেড়ে দেয় তার ওপর আল্লাহতায়ালার কোনো জিম্মাদারি থাকল না।’ (মুসনাদ আহমাদ : ৫/২৩৮)

নামাজ না পড়লে ইহকালেও বহু ক্ষতি হবে


হযরত বুরাইদা (রা.) বলেন, নবী কারিম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আসরের নামাজ পরিত্যাগ করল, তার সব আমল বরবাদ হয়ে গেল।’ (সহিহ বুখারি : ৫৫৩, ৫৯৪)

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তির আসরের নামাজ ছুটে গেল তার পরিবারবর্গ ও ধন-সম্পদের যেন বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল।’ (সহিহ বুখারি : ৫৫২)

মহান আল্লাহ আমাদের যথাসময়ে গুরুত্বসহকারে নামাজ পড়ার তাওফিক দান করুন এবং নামাজ না পড়ার শাস্তি থেকে বেচে থাকার তাওফিক দান করুন, আমিন।