হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর স্ত্রীদের নাম

আজকের আলোচনা হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর স্ত্রীদের নাম। হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর স্ত্রীদের উম্মাহাতুল মু’মিনীন বলা হয় যার অর্থ ‘মুসলমানদের মাতাগণ’। আল্লাহ তাআলা কুরআনে রাসূল সাঃ এর স্ত্রীগণকে মুসলমানদের মা হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তাই হযরত মুহাম্মাদ সাঃ এর স্ত্রীদেরকে উম্মাতুল মুমিনিন উপাধি দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

 اَلنَّبِیُّ اَوۡلٰی بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ مِنۡ اَنۡفُسِهِمۡ وَ اَزۡوَاجُهٗۤ اُمَّهٰتُهُمۡ

অর্থ: নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজদের চেয়ে ঘনিষ্ঠতর। আর তার স্ত্রীগণ তাদের মাতাস্বরূপ। (সূরা আহযাব : ৫৩)

সুতরাং মায়ের মত হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর স্ত্রীদের সম্মান ও মান্য করা মুসলমানদের জন্য ফরজ। তাই নিজ মায়ের সাথে বিবাহ যেমন হারাম, তদ্রুপ হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর স্ত্রীদের সাথে বিবাহ হারাম। কিন্তু তাদের সাথে পর্দা করা ফরজ ছিলো। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

وَ اِذَا سَاَلۡتُمُوۡهُنَّ مَتَاعًا فَسۡـَٔلُوۡهُنَّ مِنۡ وَّرَآءِ حِجَابٍ ؕ

অর্থ: আর যখন নবীপত্নীদের কাছে তোমরা কোন সামগ্রী চাইবে তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। (সূরা আহযাব : ৫৩)

নিজ মায়ের ভগ্নি ও কন্যার সাথে বিবাহ করা হারাম, কিন্তু তাদের মাতা ভগ্নি ও গর্ভজাত কন্যার সাথে বিবাহ সম্পর্ক হারাম ছিল না।

হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর ১১ জন স্ত্রী ছিলেন, তিনি জীবিত থাকা অবস্থাতেই দুই জনের মৃত্যু হয়। তিনি ইন্তেকালে সময় বাকি ৯ জন জীবিত ছিলেন। নিম্নে হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর স্ত্রীদের নাম -এর তালিকা দেওয়া হলো।

হযরত খাদীজা (রা)

যখন হযরত খাদীজার সাথে হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর বিবাহ হয় তখন রাসূল সাঃ এর বয়স ছিল পঁচিশ বছর। আর হযরত খাদীজার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। হযরত খাদীজাই রাসূল সাঃ এর প্রথম স্ত্রী। খাদীজা রাযীঃ জীবতি থাকা কালে রাসূলুল্লাহ সাঃ অন্য কোন বিবাহ করেননি। রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বয়স যখন পঞ্চাশ বছর তখন হযরত খাদীজা পয়ষট্রি বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

ইতঃপূর্বে হযরত খাদীজা রাযঃ আও দুই বিবাহ হয়েছিল। আবু হালা ইবনে যুরারার সাথে তাঁর প্রথম বিবাহ হয়। আবূ হালার ঔরসে হিন্দ নামে এক পুত্র ও যয়নব নামে একজন কন্যা জন্মগ্রহণ করে। আবূ হালার মৃত্যুর পর উতায়্যিক ইবন আবিদ এর সাথে তার দ্বিতীয় বিবাহ হয়। উতায়্যিকের ঔরসে হিন্দ নামে তাঁর এক কন্যা জন্মগ্রহণ করে। উতায়্যিকের মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ সাঃ এর সাথে তার তৃতীয় বিবাহ হয়।

তার গর্ভে রাসূলুল্লাহ সাঃ এর দুই পুত্র ও চার কন্যা জন্মগ্রহণ করেন, পুত্রদ্বয় শৈশবেই ইন্তেকাল করেন। কন্যাদের নাম : হযরত ফাতিমা, হযরত যয়নব, হযরত রুকায়্যা, ও হযরত উম্মে কুলসূম।

হযরত সাওদা (রা)

তিনি প্রথমে হযরত সকরান ইবনে আমরের সাথে হযরত সওদার বিয়ে হয়েছিল। ইসলাম প্রচারের প্রথমিক যুগেই তারা স্বামী স্ত্রী উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। হাবশায় দ্বিতীয় হিজরতে তারা উভয়ে অংশগ্রহণ করেন। হাবশা হইতে মক্কায় প্রত্যাবর্তনের কিছু দিন পর সকরান পরলোক গমন করেন। হযরত খাদীজর মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ সাঃ শোকাকুর হয়ে পড়েন। বাড়ী-ঘর এবং শিশু ছেলে-মেয়েদের যত্ন এবং তত্ত্বাবধান করাও অসুবিধা হয়ে দাঁড়ায়। এই সময় হযরত খাওলা বিনতে হাকীম রাসূলুল্লাহ সাঃ এর কাছে হাযির হয়ে বললেন: এই অবসথা আপনার একজন সহানুভুতিশীল জীবন সঙ্গিনীর প্রয়োজন। রাসূল সাঃ এর সম্মতি নিয়ে খাওলা হযরত সাওদা (রা) এর পিতার নিকট বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যান। হযরত সাওদা (রা) বিয়ের জন্য তার বাবা কোন আপত্তি করেন নি । তাই নির্দিষ্ট সময়ে সাওদা (রা) এর বিবাহ তার মিতা, রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে চারশত দিরহাম এর বিনিময়ে বিবাহ করিয়ে দেন।

হযরত আয়েশা (রা)

তিনি ছিলেন হযরত আবু বকরের কন্যা। রাসূলুল্লাহ (সা) এর নবুওয়াতের চতুর্থ সনে তার জন্ম হয়। অতি শৈশবে যখ তিনি পুতুল নিয়ে খেলা করতেন তখনই তার বিচক্ষণ দৃষ্টিভঙ্গি, বু্দ্ধিমাত্তার পরিচয় দিয়েছেন। হায়য, নিফাস, প্রসব ও স্বামী সহবাস সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তে এমন অনেক বিষয় আছে যা একজন পুরুষ নিজের স্ত্রী ছাড়া অন্য কাউকে বলা সম্ভব না। মূল কথা হলো নারী সুলভ মাসআলাসমূহ প্রচারের জন্য হযরত আয়েশা (রা) এর ন্যায় বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান নারীরই প্রয়োজন ছিল। নবুওয়াতের দশ বছর হযরত আয়েশার বয়স ছিলো ছয় বছর, এই বছরই হযরত খাদীজার (রা) ইন্তেকাল করেন।

হযরত খাদিজার মৃত্যুর পর হযরত খাওলা বিনতে হাকীম রাসূলুল্লাহ (সা) এর সম্মিতক্রমে হযরত আয়িশার মা উম্মু রোমানের নিকট তার বিয়ের প্রস্তাব করেন। এরপূর্বেই হযরত আবু বকার (রাযি) হযরত আয়েশাকে যুবায়ের ইবনে মুতআমের পুত্রের নিকট বিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু যুবায়েরে ইবনে মুতআম আবু বকর (রা) ইসলাম গ্রহণের কারণে নিজের পুত্রের সাথে বিয়ে ভেঙ্গে দিলেন। তাই হযরত আবু বকর রাসূল (সা) এর বিয়ের প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন। এবং আয়েশাকে রাসূল (সা) এর সাথে বিয়ে দিয়ে দিলেন

অনেক অমুসলিম বা ইসলাম বিদ্বেষীরা বলে থাকে রাসূল (সা) বাল্য বিবাহ করেছিলেন, আমার উত্তর হলো তখনকার সময় বাল্য বিয়ে ছিলো খুবই সাভাবিক একটি ব্যাপার, তাই আবু বকর হযরত আয়েশাকে যুবায়ের ইবনে মুতআমের পুত্রের নিকট বিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাই আমাদের কোন ঘটনা পর্যালচনা করতে হলে অবশ্যই সেই সময়ের সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হবে।

বিয়ের পর রাসূলুল্লাহ তিন বছর মক্কায় অবস্থান করেন। অতপর মদিনায় হিজরতের হযরত আয়েশা (রা) রাসূল (সা) এর গৃহে আসেন তখন তার বয়স ছিলো নয় বছর।

হাদীস গ্রন্থসমূহে হযরত আয়েশরা (রা) কর্তৃক ২২১০ টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। কোন কোন আলেম মনে করেন শরীয়তের বিধানের এক চতুর্থাংশ হযরত আয়েশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। রাসূল (সা) এর সকল স্ত্রীদের মধ্যে তিনিই ইসলামী জ্ঞান ভান্ডারে সবচে বেশি অবদান রেখেছেন।

হযরত হাফসা (রা)

তিনি ছিলেন হযরত উমরের কন্যা । রাসূলুল্লাহ (সা) এর নবুওয়াতপ্রাপ্তির পাঁচ বছর পূর্বে তার জন্র হয়। প্রথমে হযরত খুনায়স ইবনে হুযাফার সাথে তার বিয়ে হয়। হযরত হাফসা স্বামীর সাথে হিজরত করে মদিনায় যান। হযরত খুনায়স বদর-যুদ্ধে আহত হয়ে পরে শহীদ হন। হযরত হাফসার গর্ভে হযরত খুনায়সের কোন সন্তানাদি জন্মগ্রহণ করেনি।

হযরত উমরের বীরত্ব ও অসীম সাহসিকাতার অধিকারী ছিলেন। যেমন ছিল তাহার অদম্য সাহস তেমনি ছিল তার অটল সংকল্প। হাফসা বাপের বেটী। তার পিতার মতই সাহসী ও উগ্র স্বভাবসম্পন্ন। এই উগ্র স্বভাবের দরুন একবার রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে তালাক দিতে চেয়েছিলেন। তখন হযরত জিবরাঈল বলিলেন “[হে রাসূলুল্লাহ] আপনি তাকে তালাক দিবেন না। কারণ তিনি খুব রোযা রাখেন এবং রাত্রি জাগরণ করে আল্লাহ তআলার ইবাদত-বন্দেগী করেন”। হযরত মুআবিয়া (রা) এর খিলাফতকালে ৪৫ হিজরীতে ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

হযরত যয়নব (রা)

তাকে ‘উম্মুল মাসাকীন’ অর্থ ‘মিসকীনদের মা’ নামে ডাকা হয়ে থাকে। অতি অতি আনন্দের সাথে গরীব মিসকীনদেরকে খাওয়াতেন। তাই ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই তিনি উম্মুল মাসাকীন নামে প্রসিদ্ধ লাভ করেন।

প্রথমে রাসূলুল্লাহ (সা) এর ফুফাতো ভাই হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জহশের সাথে তার বিয়ে হয়। হযরত আব্দুল্লাহ তৃতীয় হিজরীতে ওহুদ যুদ্ধে শহীদ হন।

হযরত আব্দুল্লাহ শহীদ হওয়ার পর তৃতীয় হিজরীতেই রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের দুই তিন মাস পরেই চতুর্থ হিজরীতে তিনি ইন্তিকাল করেন। রাসূল (সা) জীবিত থাকা প্রথমে হযরত খাদিজা পরে হযরত যয়নব ইন্তিকাল করেন। রাসূল (সা) স্বয়ং তার জানাযা পড়ান এবং জান্নাতুল বাকীতে তাকে দাফন করেন।

হযরত উম্মু সালামা (রা)

তার প্রকৃত নাম ছিলো হিন্দ। তিনি কুরায়াশেয়ের প্রসিদ্ধ সরদার আবূ উমায়্যার কন্যা ছিলেন। প্রথমে আব্দুল আসাদের পুত্র আব্দুল্লাহর সাথে তার বিয়ে হয়েছিল। আব্দুল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সা) এর ফুফু বাররার পুত্র ছিলেন। হযরত আব্দুল্লাহ ও হযরত হিন্দ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের পূর্বে একেবারে প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণ করেন।

হযরত আব্দুল্লাহ সর্বপ্রথম স্ত্রীকে নিয়ে হাবশায় হিজরত করেন। সেখানেই তাদের একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তার নাম ছিল সালামা। তার নাম অনুসারেই হযরত আব্দুল্লাহে আব সালামা এবং হযরত হিন্দকে উম্মু সালামা বলা হয়। হাবশা হতে ফিরে তারা মক্কায় আসেন, অতপর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। নারীদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম হিজরত করে মদিনায় যান। হযরত আবু সালাম প্রসিদ্ধ অশ্বারোহী ছিলেন। বদর ও ওহুদ উভয় যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। ওহুদ-যুদ্ধে তিনি সাংঘাতিকভাবে আহত হন। এই আঘাতের ফলে তিনি ইন্তেকাল করেন।

হযরত আবু সালামার ৩ টি পুত্র সন্তান ও ৩ টি কন্যা সন্তার রেখে দুনিয়া ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর পর উম্মু সালামা একা হয়ে পড়েন।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ন, ধৈর্যশীলা, শেধাবী। ফিকহ শাস্ত্রে তার প্রখর জ্ঞান ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) এর ইন্তেকালে পর বড় বড় সাহাবীগণ তার কাছে মাসআলা জিজ্ঞাসা করতেন।

হযরত আবু সালামার মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত উম্মু সালামাকে বিয়ের প্রস্তাব জানাইলেন। কিন্তু তিনি কিছু কারণ দেখিয়ে বিয়েতে আপত্তি জানালেন।

রাসূল (সা) উত্তরে বললেন তোমরা মনে ঈর্ষাভাব না হওয়ার জন্য আমি আল্লাহর দরবারে দুআ করবো। তোমরা সন্তানরা আমার সন্তানে পরিণত হবে, সুতরাং তাদের তত্ত্বাবধানের দায়ত্বি আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ন্যস্ত। থাকিবে। তোমার বয়স থেকে আমার বয়স বেশি। আর এই বিয়েতে তোমার কোন অভিভাবকই অসম্মত হবে না। এবং উম্মু সালামা তখন বিয়ের ব্যাপারে সম্মতি দিলেন।

রাসূলুল্লাহ (সা) এর স্ত্রীদের মধ্যে হযরত উম্মু সালামা সকলের শেষে ইন্তেকাল করেন।

হযরত যয়নব (রা)

তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা) এর ফুফু উমায়মার কন্যা। তার পিতার নাম ছিল জইশ। হযরত আব্দুল্লাহ, উবায়দুল্লাহ ও আবু আহমদ, হযরত যয়নবের তিন ভাই ছিলেন। হযরত যয়নবের ভাই-ভগ্নি সকলেই প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। হযরত আব্দুল্লাহ উহুদ যুদ্ধে শহীদ হন এবং তার মামা হযরত হামযার সাথে একই কবরে দাফন করা হয়। উবায়দুল্লাহ স্ত্রী সহ হাবশায় হিজরত করে, এবং সেখানে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে। উম্মু হাবীবাকে পরিত্যাগ করে। (অতপর, বাদশা নাজ্জাশীর মধ্যস্থতায় রাসূল (সা) এর সাথে উম্মু হাবীবার বিবাহ হয় )

রাসূলুল্লাহ (সা) এর চেষ্টায় প্রথমে হযরত যায়েদ ইবনে হারিসার সাথে হযরত যয়নবের বিয়ে দেয়, হযরত যায়েদ ইবনে হাসির রাসূল (সা) এর পালক পুত্র ছিলেন। তাদের মাঝে অমিল হওয়ার কারণে হযরত যায়েদ তাকে পরিত্যাগ করেন। অতপর রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে বিয়ে হয়। আর আরবে জাহেলি যুগে পালক পুত্রকে নিজের ঔরসজাত পুত্রের মতো মনে করা হতো। তাই রাসূল (সা) হযরত যয়নবকে বিয়ে করে (পালক পুত্রের) তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে করে এই প্রথাকে বিলুপ্ত করেন।

২০ হিজরীতে ৫৩ বছর বয়সে হযরত যয়নব মদিনায় ইন্তেকাল করেন।

হযরত যুওয়ায়রিয়া (রা)

হযরত যুওয়ায়রিয়া (রা) বনূ মুস্তালিক গোত্রের সরদার হারিস ইবনে যিরারের কন্যা ছিলেন। মুরায়সীর যুদ্ধে তার স্বামী মুসাফি নিহত হয় এবং তিনি গ্রেফতার হয়ে সাবিত ইবনে কায়েস আনসারীর দাসীতে পরিণত হন। হযরত সাবিত ৯ ইকিয়া স্বর্ণ নিয়ে তাকে মুক্তি দিতে চাইলে। হযরত যুওয়ায়রিয়া (রা) সাহায্য চাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) এর খিদমতে আসিলেন। এবং রাসূল (সা) ‍মুক্তিপণ আদায় করে তাকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করেন। এবং রাসুল (সা) তার সম্মতিক্রমে তাকে বিয়ে করেন। মুরায়সী যুদ্ধে মুস্তারিক গোত্রের শত শত লোক দাসদাসীতে পরিণত হয়েছিল। সাহাবীগণ এই বিয়ের সংবাদ শোনতে পেয়ে বলতে থাকলেন। রাসূল (সা) এর শ্বশুর বংশীয় লোকদেরকে দাস-দাসী বানিয়ে রাখা উচি না। তাই তারা সাত শত মুস্তালিককে মুক্ত করে দেন।

পঞ্চম হিজরীতে তার বিয়ে হয় এবং ৬৫ বছর বয়সে ৫০ হিজরীর রবীউল আউয়াল মাসে তার ইন্তিকাল হয়। জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

হযরত উম্মু হাবিবা (রা)

হযরত উম্মু হাবিবা (রা) মক্কার প্রসিদ্ধ সরদার আবূ সুফিইয়ানের কন্যা ছিলো। তার প্রকৃত নাম ছিলো রমলা। উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নবের ভাই উবায়দুল্লাহর সাথে তার বিয়ে হয়। এবং তারা ইসলাম গ্রহণ করে হাবশায় হিজরত করেন। সেখানে হাবিবা নামে তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করেন। তার নাম অনুসারেই তাকে উম্মু হাবিবা বলা হয়।

হাবশায় যাওয়ার পর উবায়দুল্লাহ খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করে এবং উম্মু হাবিবাকে তালাক দেন। এই ঘটনায় উম্মু হাবিবা (রা) নিরাশ্রয় হয়ে পরেন। তার এই বিপদ জানতে পেরে রাসূলুল্লাহ (সা) আমর যমরীকে হাবশার রাজা নাজ্জাশীর নিকট উম্মু হাবিবার ব্যাপারে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। বাদশা নাজ্জাশী আবরাহা নামে এক দাসিকে পাঠিয়ে উম্মু হাবিবাকে এই সংবাদ জানালে, তিনি খুশিতে তার সকল অলঙ্কার দাসীকে পুরস্কার হিসেবে দিয়ে দিলেন এবং তার মামাতো ভাই খালিদ ইবনে সাঈদকে বিয়ের উকিল বানিয়ে নাজ্জাশীর নিকট প্রেরণ করলেন।

সন্ধ্যার পর নাজ্জাশী হযরত জাফর ও অন্যান্য মুসলমানদেরকে সমবেত করে তাদের সামনে বিয়ে পড়িয়ে দেন। বাদশা নাজ্জাশী নিজেই বিয়ের খুৎবা পাঠ করেন। এই বিয়েতে চারশত দীনার (স্বর্ণমুদ্রা) মহর নির্ধারিত করেন। রাসূল (সা) এর পক্ষ থেকে বাদশা নাজ্জাশী নিজে মহর আদায় করে দেন।

নূরানী পদ্ধতিতে কুরআন শিক্ষা

রোজা ভঙ্গের কারন

অতপর বাদশাহ নাজ্জাশী শুরাহবীল ইবনে হাসানার সাথে তাকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর খেদমতে প্রেরণ করেন।

সপ্তম হিজরীতে তার বিয়ে হয়। ৪৪ হিজরীতে তিনি মদিনায় পরলোক গমন করেন। মদীনাতে তাকে দাফন করা হয়।

হযরত সাফিয়্যা (রা)

হযরত সাফিয়্যা হযরত হারুন (আ) এর বংশধর ছিলেন। তার পিতার নাম ছিল হুয়ায় ইবনে আখতাব। প্রথমে সাল্লাম ইবনে মিশকামের সাথে তার বিয়ে হয়। তারপর দ্বিতীয়বার কিনানার সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েকদিন পর খায়বার যুদ্ধে তার স্বামী, পিতা ও ভাই সব নিহত হয়। এবং তিনি মুসলমানদের হাতে বন্দি হন।

যখন সমস্ত কয়েদী একত্রিত করা হলো তখন হযরত দিহয়াতূল কলবী রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট একটি দাসী চাইলেন। তিনি বললেন: আচ্ছা, তুমি দেখে একজন দাসী নিয়ে যাও। হযরত দিহইয়া হযরত সাফিয়্যাকে পছন্দ করলেন। তখন একজন সাহাবী বললো: হে নবী! যে মেয়েটি নবী বংশে জন্মগ্রহণ করেছে এবং বনু নাযীর ও কুরায়যা গোত্রের সরদারের কন্যা সে মেয়েকে আপনি দিহয়াতুল কালবীকে দান করেছেন। রাসূল (সা) দিহইয়াতুল কালবীকে ডাকলেন এবং তাকে হযরত সাফিয়্যা (রা) পরিবর্তে অন্য একটি দাসী দান করলেন। অতপর তিনি হযরত সাফিয়্যাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে রাসূল (সা) তাকে বিয়ে করেন। খায়বার হতে ফিরার পথে সহবা নামক স্থানে রাসূল (সা) হযরত সাফিয়ার সাথে রাত্রি যাপন করেন এবং বিবাহের ওলিমা করেন।

রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত সাফিয়্যাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। একদিন রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত সাফিয়্যার কাছে গিয়ে দেখতে পেলেন, যে তিনি কান্না করছেন। কারণ জিজ্ঞাসা করলে সাফিয়্যা বলেন- হযরত আয়েশা ও হযরত যয়নব বলেছেন- আমরা রাসূল (সা) এর স্ত্রীদের মধ্যে শ্রেষ্টতম। কারণ আমরা তার স্ত্রী এবং বোন। রাসূল (সা) বললেন: তুমি কেনো বলনি যে, তোমরা আমার চেয়ে উত্তম হতে পারো না। কারণ হযরত হারুন (আ) আমার পিতা, হযরত মূসা (আ) আমার চাচা এবং হযরত মুহাম্মদ (সা) আমার স্বামী।

৫০ হিজরীতে হযরত সাফিয়্যার ইন্তিকাল হয় এবং জান্নাতুল বাকী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

হযরত মায়মুনা (রা)

হযরত মায়মুনা (রা) সম্ভ্রান্ত বংশের মেয়ে ছিলেন। তার পিতার নাম ছিলো হারিস, তিনি ছিলেন মক্কা নগরীর হিলাল গোত্রের লোক। তার মা হিন্দ বিনতে আউফ ছিলেন ইয়েমেনের হিমার গোত্রের নারী।

তার প্রথমে মাসউদ সকফীর সাথে বিয়ে হয়। অতপর আবু রুহমা তাকে বিয়ে করে। আবু রুহমের মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে তার বিয়ে হয় । এটাই রাসূল (সা) এর শেষ বিয়ে। হযরত আব্বাস (রা) এই বিয়ের প্রস্তাব দেন এবং তিনিই এই বিয়ে পড়ান। কাযা উমরার সময় ‘সরফ’ নামক স্থানে বিয়ে হয়। এখানেই হযরত মায়মুনা (রা) এর সাথে রাসূল (সা) এর মিলন হয়। ৫১ হিজরীতে উক্ত ‘সরফ’ নামক স্থানেই তার মৃত্যু হয়। এবং এখানেই তাকে দাফন করা হয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস তার জানাযা পড়ান। এবং তাকে কবরে রাখেন। হযরত আব্দুল্লাহ তার ভাগনে ছিলেন।

রাসূল (সা) এর কানীয়

রাসূল (সা) এর ১১ জন স্ত্রী ছাড়াও আরও চার জন কানীয় ছিলেন। তাদেরকেও রাসূল (সা) স্ত্রীদের মত সম্মান করতেন এবং পর্দা করতেন।

হযরত মারিয়া কিবতিয়া

সপ্তম হিজরীতে খৃষ্টান মিশর-রাজা মুকাওকস উপঢৌকন স্বরূপ তাকে রাসূল (সা) এর খিদমতে প্রেরণ করেন। তার গর্ভেই রাসূলুল্লাহ (সা) এর পুত্র ইবরাহীম জন্মগ্রহণ করেন। ১৫ হিজরীতে তার মৃত্যু হয় এবং জান্নাতুল বাকীতে তাকে দাফন করা হয়।

হযরত রায়হানা

তিনি কুরায়যা অথবা নাযীর বংশীয় ইয়াহুদীর কন্যা ছিলেন। বিদায় হজ্জের পর দশম হিজরীতে রাসূল (সা) -এর সম্মুখেই তার মৃত্যু হয় এবং তাকে জান্নাতুর বাকীতে দাফন করা হয়।

হযরত নসীফা

তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নব বিনতে জাহশের দাসী ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) কে হিবা করেছিলেন।

আরও একজন কানীয ছিলেন যিনি কোন এক গযওয়া হতে প্রাপ্ত ছিলেন।

রাসূল (সা) এর বহু বিবাহের উদ্দেশ্য

রাসূল (সা) এর ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন যুদ্ধে সাহাবীদের মৃত্যুর কারণে ৪টি বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছেন। কারণ যুদ্ধে সাহাবাদের শহিদ হওয়ার কারণে তাদের সন্তান এতিম এবং স্ত্রীগণ বিধবা হওয়ার কারণে তাদের জীবন চলা কষ্টকর হয়ে উঠতো, এবং তাদের দেখাশোনা করার জন্য ইসলাম বহু বিবাহ প্রবর্তন করেছেন। পাঠকগণ এই আয়াত পড়লেই বুঝতে পারবেন।

وَ اٰتُوا الۡیَتٰمٰۤی اَمۡوَالَهُمۡ وَ لَا تَتَبَدَّلُوا الۡخَبِیۡثَ بِالطَّیِّبِ ۪ وَ لَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَهُمۡ اِلٰۤی اَمۡوَالِکُمۡ ؕ اِنَّهٗ کَانَ حُوۡبًا کَبِیۡرًا ﴿۲﴾ وَ اِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا تُقۡسِطُوۡا فِی الۡیَتٰمٰی فَانۡکِحُوۡا مَا طَابَ لَکُمۡ مِّنَ النِّسَآءِ مَثۡنٰی وَ ثُلٰثَ وَ رُبٰعَ ۚ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا تَعۡدِلُوۡا فَوَاحِدَۃً اَوۡ مَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُکُمۡ ؕ ذٰلِکَ اَدۡنٰۤی اَلَّا تَعُوۡلُوۡا ؕ﴿۳﴾

অর্থ: (২) আর তোমরা ইয়াতীমদেরকে তাদের ধন-সম্পদ দিয়ে দাও এবং তোমরা অপবিত্র বস্ত্তকে পবিত্র বস্ত্ত দ্বারা পরিবর্তন করো না এবং তাদের ধন-সম্পদকে তোমাদের ধন-সম্পদের সাথে খেয়ো না। নিশ্চয় তা বড় পাপ। (৩) আর যদি তোমরা ভয় কর যে, ইয়াতীমদের ব্যাপারে তোমরা ইনসাফ করতে পারবে না। তাহলে তোমরা বিয়ে কর নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে, দুটি, তিনটি কিংবা চারটি। আর যদি ভয় কর যে, তোমরা সমান আচরণ করতে পারবে না, তবে একটি অথবা তোমাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে (দাসী)। এটা অধিকতর নিকটবর্তী যে, তোমরা যুলম করবে না। 

এখানে যুদ্ধে যারা নিহত হয়েছিলেন, তাদের বোন, সন্তান, স্ত্রীদের অসহায়ত্ব দূর করার জন্য এই বিধান পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বর্ণনা করেন, যা মূলত এতিমের হক বিষয়ে বলা হয়েছে, আমরা উপরে দেখতে পেয়েছি, রাসূল (সা) এর সকল স্ত্রীদের মাঝে শুধু আয়েশা ছিলো যার আগে বিয়ে হয়নি। আর বাকি সবার আগে বিয়ে হয়েছিলো। যা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যায় বহু বিবাহ শুধু যৌবিক চাহিদার জন্য রাসূল করেননি।.

আগের যুগের বিয়ে ছিলো কুটনৈতিক সম্পর্ক তৈরির মাধ্যম

তাছাড়া বিয়ে ছিলো আগের যুগের কুটনৈতিক সম্পর্ক তৈরির মাধ্যম, আগের যুগে বিভিন্ন সামরাজ্যের মাঝে বিয়ের মাধ্যমে শত্রুতা দূর করে বন্ধুত্ব স্থাপন করা ছিলো সাভাবিক একটি ব্যাপার, ইতিহাসে তার অনেক নজির পাওয়া যায়। তেমনি একটি উদাহারণ হলো। কুরাইশ নেতা আবু সুফইয়ান বিভিন্ন যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন কিন্তু রাসূল (সা) তার কন্যা উম্মু হাবিবাকে বিয়ে করে তখন সে আর শত্রুতা করেনি, পরে ইসলাম গ্রহণ করে। তেমনিভাবে বহু বেদুইন জাতির উপর মুস্তালিক গোত্রের প্রভাব ছিলো। তারা ছিলো আরবের দস্যু, কিন্তু হযরত জওয়ায়রিয়ার বিয়ের পর তারা আর মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধ করেনি। হযরত মায়মুনার ভগ্নিপতি ছিলো নজদের অধিপতি যাদের কারণে ৭০ জন হাফেজে কুরআন শহীদ হন। পরে সন্ধির কারণে ইসলাম প্রচার সহজ হয়ে যায়।

রাসূল (সা) এবং তার সাহাবাদের বহু বিবাহ ছিলো সমসাময়িক প্রেক্ষাপটের দাবি। তাই তা নিয়ে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর কিছু নাই। আল্লাহ আমাদের সকলকে সত্য বুঝার তাওফিক দান করুন। আমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *