ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সময়ের দাবি

আধুনিক যুগে কিছু মানুষকে বলতে শুনা যায় যে গণতন্ত্র হারাম এবং তারা ইসলামী খেলাফত তথা ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলে।

অথচ কুরআন হাদীসে সরাসরি ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার কোন দিক নির্দেশনা নেই। তাই ইসলামী খেলাফত তথা ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা বলতে আলেম-উলামা এবং ইসলামী দলগুলো যা বুঝাতে চায় বাস্তবে তা অসম্ভব।

মদিনার সনদ

তবে মদিনার সনদকে প্রথম ইসলামী পদ্ধতিতে রাষ্ট্রের রুপরেখা হিসাবে ধরা হয়। রাসূল (সা) মদিনায় আগমনের পর বুঝতে পাড়লেন, মদিনার সকল গোত্রকে একত্র না করলে, মদিনায় শান্তি প্রতিষ্টা করা সম্ভব না। তাই তিনি মদিনার সকল সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে আহ্বান করলেন। উক্ত সম্মেলনে তিনি সম্প্রীতি ও সংহতির প্রয়োজনীয়তা সকলকে ‍বুঝিয়ে বললেন। এবং সকল সম্প্রদায়ের সম্মতিতে একটি চুক্তি করা হয় যাকে মদিনার সনদ (পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান) বলা হয়।

হাফেজী কুরআন শরীফ

Hifz/Hafizi Quran-15 Lines

নাদিয়া কায়দা : Nadia Kaida

নাদিয়া আমপারা : Nadiya Ampara

নূরানী পদ্ধতিতে কুরআন শিক্ষা

মুনাফিক কাকে বলে

গণতন্ত্র সম্পর্কে ইসলাম কি বলে?

একটি ওয়াজে শোনতে পেলাম, এক বক্তা এই আয়াত দিয়ে দলিল দিচ্ছেন যে, ইসলাম ছাড়া অন্য কোন তন্ত্র-মন্ত্র নাকি হারাম, হয়তো তিনি জানেন না কিংবা জেনেও কুরআন নিয়ে মিথ্যাচার করছেন। গণতন্ত্র কোন ধর্ম না । আয়াতটি হলো

 وَ مَنۡ یَّبۡتَغِ غَیۡرَ الۡاِسۡلَامِ دِیۡنًا فَلَنۡ یُّقۡبَلَ مِنۡهُ ۚ وَ هُوَ فِی الۡاٰخِرَۃِ مِنَ الۡخٰسِرِیۡنَ ﴿۸۵﴾

অর্থ: আর যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন চায় তবে তার কাছ থেকে তা কখনই গ্রহণ করা হবে না আর সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।

জবাব: এখানে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন তন্ত্র-মন্ত্রের কথা আলোচনা হয়নি বরং অন্য কোন দ্বীন তথা ধর্মের কথা বলা হয়েছে। যেমন: খ্রিষ্টান, হিন্দু, ইত্যাদি। গণতন্ত্র কোন দ্বীন না।

গণতন্ত্র কি কুফরী বা শিরকী মতবাদ?

যে সব কারণে গণতন্ত্রকে একটি শিরকি ও কুফরি মতবাদ বলা হয়।

(১) সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রেঃ গণতন্ত্রের মূল নীতি হলো: জনগণ সকল ক্ষমতার অধিপতি বা জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস। এ কথা বললে শিরক হয় কারণ আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

 وَ قُلِ الۡحَمۡدُ لِلّٰهِ الَّذِیۡ لَمۡ یَتَّخِذۡ وَلَدًا وَّ لَمۡ یَکُنۡ لَّهٗ شَرِیۡکٌ فِی الۡمُلۡکِ وَ لَمۡ یَکُنۡ لَّهٗ وَلِیٌّ مِّنَ الذُّلِّ وَ کَبِّرۡهُ تَکۡبِیۡرًا ﴿۱۱۱﴾

অর্থ: আর আপনি বলুন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি রাজত্বে তাঁর কোন অংশীদার নাই এবং অপমান থেকে বাঁচতে তাঁর কোন অভিভাবকের দরকার নাই। সুতরাং তুমি পূর্ণরূপে তাঁর বড়ত্ব বর্ণনা করো। (সূরা বনী ইসরাঈল : ১১১)

 تَبٰرَکَ الَّذِیۡ بِیَدِهِ الۡمُلۡکُ ۫ وَ هُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرُۨ ۙ﴿۱﴾

বরকতময় তিনি যার হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব। আর তিনি সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান।  (সূরা মূলক : ১)

 ۣالَّذِیۡ لَهٗ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ وَ لَمۡ یَتَّخِذۡ وَلَدًا وَّ لَمۡ یَکُنۡ لَّهٗ شَرِیۡکٌ فِی الۡمُلۡکِ وَ خَلَقَ کُلَّ شَیۡءٍ فَقَدَّرَهٗ تَقۡدِیۡرًا ﴿۲﴾

অর্থ: যার অধিকারে রয়েছে আসমান ও যমীনের মালিকানা; আর তিনি কোন সন্তান গ্রহণ করেননি এবং সার্বভৌমত্বে তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তা নিপুণভাবে নিরূপণ করেছেন। (সূরা ফুরকান : ২)

জবাব: এই দুনিয়াতে আল্লাহ মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে ‍সৃষ্টি করেছেন, সুতরাং মানুষকে কোন রাজা-বাদশা তার নিজের মর্জিমত শাসন করবে এটা সম্ভব না, কোন সুলতান কিংবা কোন খলিফাতুল মুসলিমিন জমিনের বুকে আল্লাহর প্রতিনিধি নন, এর কোন দলিল আমার চোখে পড়েনি। বরং জমিনের বুকে আল্লাহর প্রতিনিধি হলো মানুষ। তাই মানুষ ঠিক করবে তার শাসক কে হবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,

 وَ اِذۡ قَالَ رَبُّکَ لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اِنِّیۡ جَاعِلٌ فِی الۡاَرۡضِ خَلِیۡفَۃً ؕ قَالُوۡۤا اَتَجۡعَلُ فِیۡهَا مَنۡ یُّفۡسِدُ فِیۡهَا وَ یَسۡفِکُ الدِّمَآءَ ۚ وَ نَحۡنُ نُسَبِّحُ بِحَمۡدِکَ وَ نُقَدِّسُ لَکَ ؕ قَالَ اِنِّیۡۤ اَعۡلَمُ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ﴿۳۰﴾

অর্থ: আর স্মরণ কর, যখন তোমার রব ফেরেশতাদেরকে বললেন, নিশ্চয় আমি যমীনে একজন খলীফা সৃষ্টি করছি, তারা বলল, আপনি কি সেখানে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন যে তাতে ফাসাদ করবে এবং রক্ত প্রবাহিত করবে? আর আমরা তো আপনার প্রশংসায় তাসবীহ পাঠ করছি এবং আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করছি। তিনি বললেন, নিশ্চয় আমি জানি যা তোমরা জান না।  (সূরা বাকারা : ৩০)

তাই গণতন্ত্রকে হারাম বলতে যেয়ে আলেমরা যে দলিল দেয়, সার্বভৌমত্ব আল্লাহর, আর গণতন্ত্র বলে সার্বভৌমত্বের মালিক জনগণ, (আমিও বিশ্বাস করি এবং মানি সার্বভৌমত্ব আল্লাহর) এবং গণতন্ত্র বলে সার্বভৌমত্বের মালিক জনগণ এবং তা শিরক। তাই এমন কি পদ্ধতি আপনাদের কাছে আছে যার মাধ্যমে নতুন শাসক নিয়োগ করবেন। সুতরাং সার্বভৌমত্বে যেহেতু আল্লাহর তাহলে রাজা-বাদশা কে হবে, তা জানার জন্য অবশ্যই ওহী আসা সম্ভব নয়। এই ১৪ শত বছরের ইতিহাসের কোন খেলাফত আপনাদের কাছে আইডিয়াল হতে পারে? একটু দয়া করে জানাবেন। পরিবারতন্ত্রের নামে খেলাফত, আর সুলতানী ব্যবস্থা আপনাদের কাছে বৈধ ছিলো? খোলাফায়ে রাশিদিনের পর থেকে উসমানী সালতানাতের পতন ১৯২২ পর্যন্ত সবই ছিলো রাজতন্ত্র, তা নিয়ে কোন মন্তব্য কেনো করা হয়না,কারণ এখন তা জায়েজ কিন্তু আপনাদের কাছে দলিল নাই , আর জনগণের দ্বারা নির্বাচিত শাসন ব্যবস্থা কুফুরী, শিরকী মতবাদ হয়ে গেলো । বরই অদ্ভুত আপনাদের দাবি।

(২) আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেঃ গণতন্ত্রে আইন বিধান রচনার চূড়ান্ত ক্ষমতা অর্পণ করা হয় পার্লামেন্ট সদস্যদের উপর। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য যা বলবে এবং যে বিষয়ে সম্মত হবে তা হবে দেশের আইন, যার বিরোধীতা করা অপরাধ। গণতন্ত্রে সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে কুরআন সুন্নাহর উপরে স্থান দেওয়া হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তারা কুরআন সুন্নাহ বিরোধী আইন তৈরী করতে পারে, এমনকি আল্লাহর আইনকে বাতিলও করতে পারে।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়: পতিতাবৃত্তির লাইসেন্স দেওয়া, মদের লাইসেন্স দেওয়া, সুদের বৈধতা দেওয়া, ১৮ বছরের পূর্বে বিয়ে নিষিদ্ধ করা, ১৬ বছর বয়স পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যভিচার করলে তার বৈধতা দেওয়া, স্বামীর অনুমতিতে স্ত্রী অন্য পুরুষের সাথে ব্যভিচার করলে তার বৈধতা দেওয়া, যাত্রা সিনেমা হলে প্রকাশ্যে বেহায়াপনা ও অশ্লীলতার চর্চাকে অনুমোদন দেওয়া ইত্যাদি। এ ধরনের নীতিমালা নিঃসন্দেহে আল্লাহর রূবুবিয়্যাতের (ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের) ক্ষেত্রে শিরক এবং স্পষ্ট কুফরি। কেননা আল্লাহ বলেনঃ শুনে রাখো, সৃষ্টি যার হুকুম চলবে তার। [সূরা আরাফ, আয়াত ৫৪]

তিনি আরো বলেনঃ আল্লাহ ব্যতীত কারো বিধান দেওয়ার ক্ষমতা নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তাঁকে ব্যতীত তোমরা অন্য কারো ইবাদত করো না। এটিই সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না। [সূরা ইউসুফ, আয়াত ৪০]

তিনি আরো বলেনঃ আল্লাহ নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশকে পিছনে নিক্ষেপ করার কেউ নেই। তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। [সূরা রাদ, আয়াত ৪১]

জবাবঃ আপনার এই কথাগুলোর সাথে আংশিক একমত, গণতান্ত্রিক দেশ চাইলেই কুরআন হাদীস বিরোধী আইন পাশ করতে পারে। তবে গণতান্ত্রিক ইরানে চাইলেই পারবে না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না করলে, অটোমেটিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে। আব্বাসী খেলাফত, উমাইয়া খিলাফত, উসমানী খেলাফত ইত্যাদি হলো দার দৃষ্টান্ত। নামে তারা খেলাফত হলেও কাজে ছিলো সব রাজতন্ত্র। এখন যারা খেলাফতের কথা বলে, তারা কিভাবে কোন আদর্শকে ভিত্তি করে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করবেন আমার বুঝে আসে না। কারণ তারাই বংশ পরম্পরা পীর তন্ত্র চর্চা করে আসছে, মাদ্রাসার মুহতামিমের ছেলেই মুহতামিম হচ্ছে। তাদের হাতে ক্ষমতা গেলে খেলাফতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে রাজতন্ত্রই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করলেই আল্লাহর দেয়া বিধান কে অমান্য করতে হবে এই চিন্তা করে যদি আমরা পিছিয়ে থাকি, তাহলে আমরা আর কখনো শাসন পরিবর্তন করে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করা যাবে না। অন্যের দ্বারা শাসিত হওয়াই আমাদের ভাগ্যের লিখন হয়ে যাবে। তা ছাড়া কুরআন হাদীসের আইন বাস্তবায়ন করতে হলে গণতন্ত্রের বিরোধীতা করতে হবে, এর কোন যৌক্তিক প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না। এই দুনিয়াতে মানুষ হলো খোদার প্রতিনিধি মানুষের শাসক কে হবে তা ঠিক করবে মানুষ। মানুষের শাসক ঠিক করে দেয়ার জন্য জিবরাঈল নিশ্চয়ই ওহী নিয়ে আসবে না।

সুলতান ও খলিফাতুল মুসলিমিন

আল্লাহ তাআলা হযরত দাউদ (আ), হযরত সুলায়মান (আ), জুলকারনাইন, ফেরাউন, নমরুদসহ যাদের কথা কুরআনে বর্ণনা করা করেছেন, তাদের ক্ষমতায় আসার পদ্ধতি নিয়ে কুরআনে কোন কথা উল্লেখ নেই, তাদের মাঝে কে সৎ? আর কে অসৎ?। কে জালেম আর কে ন্যায় পরায়ন?, কে মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করেছেন এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করেছেন। কে ঈমানদার, মুত্তাকী আর কে নিজেকেই খোদার আসনে বসাতে চেয়েছেন। এটাই ইসলামের শিক্ষা সুতরাং আমরা বুঝতে পারলাম যে সাম্য, ইনসাফ ভিত্তিক এবং কুরআনী আইন প্রতিষ্ঠা করা যায় এমন রাষ্ট্র পরিচালনা করাই কুরআন-হাদীসের শিক্ষা।

গণতন্ত্র নাকি রাজতন্ত্র তা নিয়ে কুরআন-হাদিসে কোন দিক নির্দেশনা নাই। রাসূল (সা)-এর হিজরতের পর থেকে উসমানী সালতানাত পতন পর্যন্ত যতজন মুসলিম শাসক তথা খলিফা, সুলতান, আমির দুনিয়াতে এসেছেন, তাদের অধিকাংশই ছিলো ন্যায়পরায়ন, কারণ এটাই ইসলামের শিক্ষা। যদিও বিপরীত ঘটনাও আছে। তারা নিজেরা আইন প্রণয়ন করেছেন,কুরআন হাদীসকে সামনে রেখে, কিন্তু কুরআন হাদিস বিরোধী কোন আইন করেননি। এটাতো কখনো কুফুরী হয়নি, তাহলে গণতন্ত্রের পার্লামেন্টে করা কোন আইন কেনো কুফুরী হবে? যদি না তা আল্লাহর হুকুমের বিরোধীতা হয়।

বৃটিশ আমলে ইংরেজী শেখা হারাম? এখন জায়েজ হয়ে গেলো কেনো?। ক্ষতি কি বৃটিশদের হয়েছে নাকি আমাদের?। এক সময় মুসলমানরা ছিলো জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত, আমরা অনিহা প্রকাশ করে পিছিয়ে পরেছি। ক্ষতি কাদের হয়েছে? আমাদের। আমরা আজ অন্যের তৈরি আবিষ্কার ভোগ করি, কিন্তু নিজেদের কোন কিছু তৈরি করার ক্ষমতা নাই। তাই মুসলমানরা আজ অমুসলিম দেশগুলোর হুকুমের গুলাম। তাই আপনি আমি যে সন্ত্রাসী না তার সার্টিফিকেট নিতে হয় ওয়াইট হাউজ থেকে।

আপনাদের গঠনমূলক মতামত আমার নিজের কোথাও ভুল হলে তা ঠিক করার জন্য সহায়ক হবে। জাযাকাল্লাহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *