খন্দকের যুদ্ধ ও আধুনিক সমস্যার সমাধান

ইসলাম এই পৃথিবীতে এসেছে সংগ্রাম আর কষ্টের মাঝে, রাসূল (সা) এর কোন মুজেযা বা কোন অতিপ্রাকৃতিক ঘটনার মধ্যে দিয়ে ইসলাম পৃথিবিতে প্রতিষ্টা লাভ করেনি। শত শত মুহাজির আনছার সাহাবা আর আল্লাহর রাসূল (সা) এর কঠিন সংগ্রাম আর কষ্টের মাঝে ইসলাম নামক বৃক্ষের জন্ম হয়েছে, খন্দকের যুদ্ধ হলো এক উজ্জল দৃষ্টান্ত।

১৪ শত বছর পর আমরা মুসলমানরা কি করছি? নামাজ, রোজা হজ্জ যাকাত আদায় করেই কি ইসলামের হক আাদয় হয়ে যায়? খন্দকের যুদ্ধতে শত্রু বাহিনীর আগমনের খবর শুনার পর, রাসূল (সা) এর পস্তুতি বর্তমান সময়ে আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু? এ নিয়েই আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ

ওহুদ রণাঙ্গন হতে ফেরার সময় আবু সুফইয়ান ঘোষণা করেছিলো, আগামী বছর বদরে তোমাদের সাথে আবার মিলিত হবো শক্তি পরীক্ষা করবো। পরে যখন আবু সুফিয়ান বুঝতে পারলো যে, শক্তিশালী বাহিনী ছাড়া তাদের একার পক্ষে মুসলিমদেরকে হারানো সম্ভব না।

তাই নির্ধারিত সময়ে বদরে আগমন না করে, সারা আরবে একটা শক্তিশালী বিদ্রোহ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, অন্য দিকে বনু নাজীর মদিনা থেকে বহিস্কার হওয়ার পর তারা যখন শুনতে পেলো, মুসলমানরা ওহুদ যুদ্ধে বিপর্যস্ত হয়েছে, এবং আবু সুফিয়ান তাদেরকে পুনরাই যুদ্ধে মিলিত হওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে তখন মুসলমানদেরকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য তারা মক্কার মুশরিকদের সাথে যেয়ে মিলিত হয়।

কুরায়েশদের যুদ্ধের জন্য উত্তেজিত করে ইয়াহুদী নেতারা আরবের বিভিন্ন গোত্রের নিকট যায়। এবং তারা তাদেরকে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য উত্তেজিত করে।

সর্বপ্রথম আবু সুফইয়ান তিনশত ঘোড়া, এক হাজার উট এবং চার হাজার কুরায়েশ সৈন্য নিয় মক্কা থেকে বাহির হয়, তারা যখন মাররুয যাহরান নামকস্থানে পৌছে তখন গাতফান, আসাদ, ফাযারা, আশজা, মুররা প্রভৃতি গোত্রের সৈন্য এসে তাদের সাথে মিলিত হয়। এখন কাফের-মুশরিকদের সৈন্য সংখ্যা ১০ হাজার। তাদের সমস্ত সৈন্য তিন ভাগে বিভক্ত করা হলো।

হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর স্ত্রীদের নাম

পরিখা খনন

যখন মদীনায় এই সংবদা পৌছলো। রাসূল (সা) এই সম্পর্কে পরামর্শ করার জন্য নিশিষ্ট সাহাবীদেরকে নিয়ে এক সভার আহ্বান করলেন। এবার শত্রুদেরকে প্রতিরুধ করার জন্য মদিনা থেকে বাহিরে যাওয়া হবে কিনা এই বিষয়ে নানা আলোচনা হতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত বাহিরে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। শুধু তাই নয়, শত্রু বাহিনীকে প্রতিরোধ করার এক অভিনব পদ্ধতিরও পরিকল্পনা করা হলো।

সালমান ফারসী বললেন: শত্রুরা যেনো সহজে শহরে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য শহরের অরক্ষিত অংশে পরিখা খনন করতে হবে। উল্লেখ্য মদিনার তিন দিক বিরাট বিরাট পাহাড় আর খেজুরের বাগান দিয়ে বেষ্টিত। তাই রাসূল (সা) অরক্ষিত অংশে পরীক্ষা খনন করার নির্দেশ দিলেন।

প্রিয় পাঠক! আমরা ২১ শতকে এসে মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞান টেকনোলজিতে পৃথিবীর অন্য দেশগুলো থেকে পিছিয়ে পরছি, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুসলমনারা আজ নির্যাতিত, অথচ রাসূল (সা) আরবের কাফের বাহিনীর আগমনের খবর শোনে, যুদ্ধের পাল্টা প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে। যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে হয় না কেটনোলজি বা জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়েও যুদ্ধ-জিহাদ করা যায়।

অবিলম্বে সাহাবাগণ পরীক্ষা খননে আত্ম নিয়োগ করলেন। কাজের সৃঙ্খলার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলমানদেরকে ১০ জন করে একটি দলকে ১০ গজ পরিখা খনন করার নির্দেশ দিলেন। পরিখা এই পরিমাণ প্রস্থ ছিলো যেনো লাফ দিয়ে ঘোড়া পরিখা পার হতে না পারে।

মদিনায় তখন খাদ্যের অভাব ছিলো। শত্রুরা কত দিন পর্যন্ত মদীনা অবরোধ করে রাখে তাও কারো জানা ছিলো না? বিপদের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করে রাখারও প্রয়োজন ছিলো। তাদের পরিখা খনন করার জন্য কোন মজদুর ছিলো না, সুতরাং সাহাবীগণ নিজ হাতেই খনন করেন। তারা অনেক সময় তিন দিন পর্যন্ত অনাহারে থেকে কাজ করতেন। খাদ্যাভাবে তাদের পেটের চামড়া তাদের পিঠের সাথে মিলে যাওয়ার অবস্থা। কুমর সোজা করে দাড়াতে পারছিলেন না। তাই পেটে পাথর বেঁধে তারা কাজ করতে লাগলেন। আবার সেই সময়টা ছিলো শীতকাল। এরপরেও তারা পরম উৎসাহের সাথে কাজ করতে থাকে। এমনকি স্বয়ং রাসূল (সা) ও পেটে পাথর বেঁধে কাজ করেছে। এবং রাসূল (সা) মাটির বোঝা মাথায় বহন করেছেন।

প্রিয় পাঠক! আমাদের মুসলিম সমাজে একটা প্রবণতা আছে যে বিশেষ করে আলেম শ্রেণীর মাঝে একটু বেশি, নতুন কোন আইডিয়া কিংবা কোন প্রযুক্তি যদি আসে আমরা তা নিয়ে অনীহা প্রকাশ করার আগে আমাদের অবশ্যই তার উপকার এবং অপকার নিয়ে ভাবতে হবে। রাস্তায় বের হলে বেগানা নারী থেকে চোখ হেফাজত করা যেমন আমাদের দায়িত্ব তেমনি নতুন আবিস্কার হওয়া যেকোন প্রযুক্তি থেকে অপকার থেকে বেচে থেকে উপকার নেওয়া আমাদের কর্তব্য। দুনিয়ার পরিবেশ প্রকৃতি এবং বাস্তবতার সাথে যদি মিল রেখে আমরা চলতে না পারি তাহলে ফিলিস্তিনের মত নিজের মাত্রিভূমি হারানো আমাদের তগদিরের লেখন হয়ে যাবে। কারণ যুগোপযোগী সমস্যার সমাধন করাই নববী আদর্শ যা আমারা খন্দক যুদ্ধ থেকে বুঝতে পারি। তাই জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযোক্তি নির্ভর না হয়ে, আমরা মুসলিম জাতি পৃথিবীতে অনেকটাই অধিকার শূন্য।

মদীনা অবরোধ

শত্রুসৈন্য পৌঁছাবার পূর্বেই রাসূল (সা) মহিলা শিশুদেরকে অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত ও নিরাপদ একটি কেল্লায় স্থানান্তরিত করলেন।

মাত্র ৩ হাজার সৈন্য অপর দিকে ১০ হাজার শত্রু-সৈন্য আজ তারা কঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন। কিন্তু আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি তাদের বিশ্বাস ছিলো অটল। আল্লাহর রাসূলকে আল্লাহ নিশ্চয়ই জয়যুক্ত করবেন। আল্লাহ তার পবিত্র ইসলাকে নিশ্চয়ই রক্ষা করবেন। এই বিশ্বাসেই তাদের অন্তর ছিলো পরিপূর্ণ। তাই তাদের চোখে মুখে ভায়ভীতি লেশমাত্র ছিলো না।

আল্লাহ তাআলা সূরা আহযাবে মর্মস্পর্শী ভাষায় তা উল্লেখ করেনঃ-

 اِذۡ جَآءُوۡکُمۡ مِّنۡ فَوۡقِکُمۡ وَ مِنۡ اَسۡفَلَ مِنۡکُمۡ وَ اِذۡ زَاغَتِ الۡاَبۡصَارُ وَ بَلَغَتِ الۡقُلُوۡبُ الۡحَنَاجِرَ وَ تَظُنُّوۡنَ بِاللّٰهِ الظُّنُوۡنَا ﴿۱۰﴾  هُنَالِکَ ابۡتُلِیَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ وَ زُلۡزِلُوۡا زِلۡزَالًا شَدِیۡدًا ﴿۱۱﴾  وَ اِذۡ یَقُوۡلُ الۡمُنٰفِقُوۡنَ وَ الَّذِیۡنَ فِیۡ قُلُوۡبِهِمۡ مَّرَضٌ مَّا وَعَدَنَا اللّٰهُ وَ رَسُوۡلُهٗۤ اِلَّا غُرُوۡرًا ﴿۱۲﴾  وَ اِذۡ قَالَتۡ طَّآئِفَۃٌ مِّنۡهُمۡ یٰۤاَهۡلَ یَثۡرِبَ لَا مُقَامَ لَکُمۡ فَارۡجِعُوۡا ۚ وَ یَسۡتَاۡذِنُ فَرِیۡقٌ مِّنۡهُمُ النَّبِیَّ یَقُوۡلُوۡنَ اِنَّ بُیُوۡتَنَا عَوۡرَۃٌ ؕۛ وَ مَا هِیَ بِعَوۡرَۃٍ ۚۛ اِنۡ یُّرِیۡدُوۡنَ اِلَّا فِرَارًا ﴿۱۳﴾

অর্থ: (১০) যখন তারা তোমাদের কাছে এসেছিল তোমাদের উপরের দিক থেকে এবং তোমাদের নীচের দিক থেকে আর যখন চোখগুলো বাঁকা হয়ে পড়েছিল এবং প্রাণ কন্ঠ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। আর তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানা রকম ধারণা পোষণ করছিলে। (১১) তখন মুমিনদেরকে পরীক্ষা করা হয়েছিল। আর তারা ভীষণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল।  (১২) আর স্মরণ কর, যখন মুনাফিকরা ও যাদের অন্তরে ব্যাধি ছিল তারা বলছিল, আল্লাহ ও তার রাসূল আমাদেরকে যে ওয়াদা দিয়েছিলেন তা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। (১৩) আর যখন তাদের একদল বলেছিল হে ইয়াসরিববাসী, এখানে তোমাদের কোন স্থান নেই তাই তোমরা ফিরে যাও। আর তাদের একদল নবীর কাছে অনুমতি চেয়ে বলছিল, আমাদের বাড়ি-ঘর অরক্ষিত, অথচ সেগুলো অরক্ষিত ছিল না। আসলে পালিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।

কিন্তু যারা প্রকৃত ঈমানদার ছিলো তারা বিন্দুমাত্র বিচলিত হন নাই। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

 وَ لَمَّا رَاَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ الۡاَحۡزَابَ ۙ قَالُوۡا هٰذَا مَا وَعَدَنَا اللّٰهُ وَ رَسُوۡلُهٗ وَ صَدَقَ اللّٰهُ وَ رَسُوۡلُهٗ ۫ وَ مَا زَادَهُمۡ اِلَّاۤ اِیۡمَانًا وَّ تَسۡلِیۡمًا ﴿ؕ۲۲﴾

অর্থ: আর মুমিনগণ যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখল তখন তারা বলল, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদের যে ওয়াদা দিয়েছেন এটি তো তাই। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সত্যই বলেছেন (যেহেতু শত্রু সৈন্যের এই বিভীষিকা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতার প্রতিপাদক তাই)। এতে তাদের ঈমান ও আত্মসমর্পণই বৃদ্ধি পেল।

হাফেজী কুরআন শরীফ

Hifz/Hafizi Quran-15 Lines

নাদিয়া কায়দা : Nadia Kaida

নাদিয়া আমপারা : Nadiya Ampara

নূরানী পদ্ধতিতে কুরআন শিক্ষা

প্রিয় পাঠক! খন্দকের যুদ্ধয়ে আল্লাহর সাহায্য তখনই আসে যখন রাসূল (সা) ও তার সাহাবারা নিজেদের চেষ্টার সর্বচ্চটা দিয়েছে। এর পরেই আল্লাহর সাহায্য এসেছে। কিন্তু আমাদের বর্তমান সময়ে, মুসলমানদেরকে এমনকি আলেমদেরকে দেখা যায়, শত্রুপক্ষের সাথে তাল মিলিয়ে অর্থনৈতিক, সামরিক, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নয়ন সাধনে তাদের অনিহা। অথচ নববী আদর্শ আমাদেরকে শিক্ষা দেয় আগে শত্রুর হামলা মুকাবেলায় প্রস্তুতি নাও, এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করো।

One thought on “খন্দকের যুদ্ধ ও আধুনিক সমস্যার সমাধান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *