মজলিসে শুরা কি

মজলিসে শুরা হলো কোন কাজ সম্পাদন করার জন্য পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করাকে বলে। কুরআন মুসলমানদেরকে তাদের সামগ্রিক বিষয়গুলির ব্যাপারে একে অপরের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে। উদাহরণস্বরূপ: কাউন্সিল বা গণভোট শুরা নীতির সাথে মজলিসে শুরার অনেকটাই মিল আছে।

ইসলামি প্রশাসন ব্যবস্থায় মজলিস-উস-শুরার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রকৃতপক্ষে প্রাক-ইসলামি যুগ হতে শুরু করে বর্তমান কালেও মজলিসে শুরা বলবৎ রয়েছে।

মজলিসে শুরা কি? কুরআনের আয়াত

وَ الَّذِینَ استَجَابُوا لِرَبِّهِم وَ اَقَامُوا الصَّلٰوۃ و اَمرُهُم شُورٰی بَینَهُم وَ مِمَّا رَزَقنٰهُم یُنفِقُون

আর যারা তাদের রবের আহবানে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, তাদের কার্যাবলী তাদের পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন করে এবং আমি তাদেরকে যে রিয্ক দিয়েছি তা থেকে তারা ব্যয় করে। (সূরা শুরা : ৩৮)

১ লাখ টাকায় যাকাত কত?

আল্লাহ তাআলা মানুষকে বিভিন্ন প্রকৃতিতে সৃষ্টি করেন। মানুষের স্বভাবকে অভিন্ন করে সৃষ্টি করেননি। একেক বিষয়ে একেকজন পারদর্শী। পৃথিবীর একেক বিষয়ে এক এক জন পারদর্শী। সে জন্য আমাদের কোনো কাজ করার প্রয়োজন হলে আমরা সে ব্যাপারে অভিজ্ঞদের শরাণপন্ন হতে হয়। এর মাধ্যমে আমাদের সামনে উত্তম পথ উন্মোচিত হয়। কখনো আমাদের আমরা এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হই, আমাদের করণীয় কী, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকি, কোনটা রেখে কোনটা গ্রহণ করব, সে বিষয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমাদের জন্য বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে পরামর্শ।

فَبِمَا رَحمَۃٍ مِّنَ اللّٰهِ لِنتَ لَهُم وَ لَو کُنتَ فَظًّا غَلِیظَ القَلبِ لَانفَضُّوا مِن حَولِکَ فَاعفُ عَنهُم وَ اسۡتَغفِر لَهُم وَ شَاوِرهُم فِی الۡاَمۡرِ فَاِذَا عَزَمتَ فَتَوَکَّل عَلَی اللّٰهِ اِنَّ اللّٰهَ یُحِبُّ المُتَوَکِّلِینَ 

অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণে তুমি তাদের জন্য নম্র হয়েছিলে। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের, কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। আর কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরার্মশ কর। অতঃপর যখন সংকল্প করবে তখন আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালবাসেন। (সুরা : আল-ইমরান : ১৫৯)

রাসূল (সা.)  ও মজলিসে শুরা

শুরা এত অত্যধিক গুরুত্বের কারণে রাসূল (সা.) শুরা (পরামর্শ) করতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে বেশি পরামর্শকারী অন্য কাউকে দেখিনি। (সহিহ ইবনে হিব্বান : ৪৮৭২)

রাসূল (সা.) যেখানে পরামর্শের গুরুত্ব দিতেন, সেখানে আমরা তো এর প্রতি আরো বেশি মুখাপেক্ষী।

ব্যক্তিগত বিষয়ে শুরা

আমরা ব্যক্তিগত কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তহিনতায় ভুগী, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্ষেত্রে হিমশিম খেতে হয়। তখন সে বিষয়ে শুরা (পরামর্শ) করলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়ে যায়। সে জন্য রাসূল (সা.) ব্যক্তিগত বিষয়েও মজলিসে শুরা প্রতিষ্ঠা করার জন্য সাহাবাদেরকে তাগিদ দিতেন। ফাতেমা বিনতে কাইস (রা.) বলেন, একদা আমি রাসূল (সা.)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলাম যে মুআবিয়া ইবনে আবু সুফয়ান (রা.) ও আবু জাহম (রা.) আমাকে বিবাহের জন্য পয়গাম পাঠিয়েছে। (এ ক্ষেত্রে আমি কী করব?) রাসূল (সা.) বললেন, আবু জাহম এমন লোক যে তার কাঁধ থেকে লাঠি নামায় না। আর মুআবিয়া তো নিঃসম্বল, গরিব মানুষ, বরং তুমি ওসামা ইবনে জায়েদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হও। কিন্তু আমি তাঁকে পছন্দ করলাম না, পরে তিনি আবার বললেন, তুমি ওসামাকে বিয়ে করো। কিন্তু আমি তাঁকে পছন্দ করলাম না। তিনি আবার বললেন, তুমি ওসামাকে বিয়ে করো। তখন আমি তাঁর সঙ্গে বিবাহ করে নিলাম। আর আল্লাহ এতে আমাকে বিরাট কল্যাণ দান করলেন। আর আমি ঈর্ষার পাত্রে পরিণত হলাম। (সহিহ মুসলিম : ৩৫৮৯) 

রাষ্ট্রীয় বিষয়ে মজলিসে শুরা

রাসূল (সা.) রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। হাদিসের কিতাবে এসংক্রান্ত অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে, ওহুদের যুদ্ধের সময়, হুদাইবিয়াসহ বিভিন্ন যুদ্ধে রাসূল (সা.) সাহাবাদের সঙ্গে গুরুত্বসহ পরামর্শ করেন। আর সাহাবায়ে কেরাম প্রত্যেকেই নিজের মতামত রাসূলের সামনে পেশ করেন।

মজলিসে শুরা কি বাধ্যতামূলক?

প্রশ্ন হলো, শুরা কতটা বাধ্যতামূলক? আক্ষরিক অর্থে শুরা পরামর্শ করা বুঝায়। ব্যক্তিপর্যায়ে এক বন্ধু তার আরেক বন্ধুর কাছে কাউকে বিয়ের ব্যাপারে পরামর্শ চাইতেই পারে। এ ক্ষেত্রে বন্ধুর পরামর্শ যাই হোক না কেন, তা মানা বাধ্যতামূলক নয়। তবে রাসূল (সা.) সামরিক, রাজনৈতিক অথবা সামাজিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেলায় শুরার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন।

শুরা কোনো ভালো সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি উপায়, যে বিষয়ে আল্লাহ ও তার রাসূল (সা) উৎসাহিত করেছেন। অতএব, ইসলামী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সামগ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলায় শুরা একটি বাধ্যতামূলক বিষয়।

হাফেজী কুরআন শরীফ

সারকথা হলো: রাষ্ট্রে মজলিসে শুরাব্যবস্থা কায়েমের প্রয়োজন মেনে নিয়ে তা কিভাবে কতটা সফল ও কার্যকর করা যায়, তার জন্য মজলিসে শুরা থেকে বিরত থাকার কোনো সুযোগ নেই। কেননা শুরার মধ্যেই কল্যাণ নিহিত আছে। আর মজলিসে শুরা ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রাণ যেমন গণতন্ত্রের জন্য ভোটাদিকার আবশ্যক। বর্তমান আধুনিক এই গণতন্ত্রের যোগে ইসলামী অনেক জরুরি বিধানের সাথে মজলিসে শুরা গুরুত্ব মানুষের মাঝে কমে গিয়েছে।