মুয়ামালাত মুয়াশারাত কি

ইসলামি জীবনব্যবস্থায় ‘মুয়ামালাত’ তথা লেনদেন। ও ‘মুয়াশারাত’ তথা আচার ব্যবহার। খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিধান। কারণ হাশরের দিন আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করলেও বান্দার হক মাফ করবেন না, তাই মুয়ামালাত মুয়াশারাত কি এই বিষয়ে আমরা আলোচনা করবো

মুয়ামালাত কি?

 ‘মুয়ামালাত’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ লেনদেন।

ইসলামের পরিভাষায়: মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সমস্যা সমাধানের জন্য বিশেষত ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ে যে কোনো ধরনের লেন-দেনকে মুয়ামালাত হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। অন্য ভাষায় পণ্যসামগ্রী বিনিময় তথা যে কোনো ধরনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ক্রয়-বিক্রয়, সমন্বয়, উপহার ও অনুদান ইত্যাদি বিষয়ে লেনদেনকে মুয়ামালাত বলে। মুয়ামালাতের মূল বিষয় বুঝতে ইসলামের প্রাথমিক যুগের দিকে দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে। মহানবী (সা.)-এর জীবন ছিল পবিত্র, পরিচ্ছন্ন এবং সংরক্ষিত।

তাঁর সাহাবাগণ নবীজির প্রত্যেকটি কথা, কাজ ও নির্দেশনাকে সংরক্ষণ করেছেন।

মহানবী (সা.)-এর বিভিন্ন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম ছিল খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা, মহানবী (সা.)-এর ব্যবসায় লেনদেন নির্ভেজাল ব্যবসার অন্যতম দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। গ্রাহকের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বদা স্বচ্ছতা এবং তাঁর সততা তাঁকে ইসলামের পূর্বে আল আমিন তথা বিশ্বাসী উপাধি দেওয়া হয়েছিল।

মুয়ামালাতের উদ্দেশ্য : মুয়ামালাতের মুখ্য উদ্দেশ্যগুলো হলো : বিশ্বাস ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে মানবজাতির মর্যাদাপূর্ণ অবস্থার উন্নতি স্বাধন করা। ইসলামী আইন সব সময় মানুষের মনন ও কর্মকাণ্ডে শৃঙ্খলা আনয়নে গুরুত্বারোপ করে থাকে। মুয়ামালাত এ ক্ষেত্রে মানবিক ব্যক্তিত্বের বিকাশে ভূমিকা পালন করে। মুয়ামালাত যেকোনো বিনিময় কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সততা, ন্যায়বিচার ও ভ্রাতৃত্ববোধের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। প্রাত্যহিক লেনদেনসহ শরিয়াহ যেকোনো বিষয়ে সীমা লঙ্ঘনকে মহান আল্লাহ পছন্দ করেন না।

وَ قَاتِلُوا فِی سَبِیلِ اللّٰهِ الَّذِیۡنَ یُقَاتِلُونَکُم وَ لَا تَعۡتَدُوا اِنَّ اللّٰهَ لَا یُحِبُّ الۡمُعتَدِینَ

আর তোমরা আল্লাহর রাস্তায় তাদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। (সুরা : বাকারা : ১৯০)

মুয়ামালাত মানুষকে ব্যাবসায়িক লেনদেনের জন্য উৎসাহিত করে, যা তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে সহায়তা করে। মহানবী (সা.) ব্যবসা-বাণিজ্যকে উৎসাহিত করে বলেছেন,

‘জীবিকার ১০ ভাগের মধ্যে ৯ ভাগই রয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে।’ (আলবানী, যঈফাহ হা/৩৪০২; যঈফুল জামে‘ হা/২৪৩৪)

ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সততা ও নিষ্ঠা বজায় রাখা

وَ اَوۡفُوا الۡکَیۡلَ اِذَا کِلتُمۡ وَ زِنُوۡا بِالۡقِسۡطَاسِ الۡمُسۡتَقِیۡمِ ذٰلِکَ خَیۡرٌ وَّ اَحۡسَنُ تَاۡوِیۡلًا

আর মাপে পরিপূর্ণ দাও যখন তোমরা পরিমাপ কর এবং সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওযন কর। এটা কল্যাণকর ও পরিণামে সুন্দরতম। (সুরা : ইসরা : ৩৫)

লেনদেনের ক্ষেত্রে বেআইনি পথ পরিহার করে বৈধতা বজায় রাখতে হবে। লেনদেন চুক্তিতে চুক্তির কোনো শর্ত বা বিধান ভঙ্গ করার পরিণতি কি হবে সে সম্পর্কে ব্যবস্থা গ্রহণের উল্লেখ থাকতে হবে। মুয়ামালাতের বিধান মোতাবেক যে কোনো লেনদেনের পক্ষগুলোর ওপর চুক্তি পূর্ণ করা বাধ্যতামূলক। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন:

 یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَوفُوا بِالۡعُقُوۡدِ

‘হে মুমিনরা! তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করবে।’ (সুরা : মায়েদা : ১)

যে কোনো পক্ষ লেনদেনের কোনো শর্ত ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা পক্ষকে শর্ত ভঙ্গের পরিণতি ভোগ করতে হবে, শাস্তি হিসেবে তা হতে পারে কোনো নির্দিষ্ট দায়িত্ব সম্পাদন করা বা কোন দায়িত্ব থেকে বের করে দেওয়া,  কোনো ক্ষতি স্বীকার করা, কোনো সুবিধা বা অধিকারের মেয়াদ স্থগিত করা অথবা ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা।

উভয় পক্ষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধের বজায় রাখা, লেনদেন চুক্তির প্রাথমিক উদ্দেশ্য। কেননা, পরস্পরের উপকারের উদ্দেশে মানুষ লেনদেন তথা ক্রয়-বিক্রয় করে থাকে। আর এভাবেই ক্রয়-বিক্রয়ের পক্ষগুলোর মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধের সৃষ্টি হয়। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,

 یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَاۡکُلُوۡۤا اَمۡوَالَکُمۡ بَیۡنَکُمۡ بِالۡبَاطِلِ اِلَّاۤ اَن تَکُوۡنَ تِجَارَۃً عَنۡ تَرَاضٍ مِّنۡکُمۡ ۟ وَ لَا تَقۡتُلُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ اِنَّ اللّٰهَ کَانَ بِکُمۡ رَحِیۡمًا

হে মুমিনগণ, তোমরা পরস্পরের মধ্যে তোমাদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না, তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসার মাধ্যমে হলে ভিন্ন কথা। আর তোমরা নিজেরা নিজদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে পরম দয়ালু।  (সুরা : নিসা : ২৯)

ফরজ নামাজ না পড়ার শাস্তি

মুয়ামালাতের গুরুত্ব : আল্লাহ তাআলা প্রতিটি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, একে অপরের ওপর নির্ভরশীল করে, এটা সত্য যে, কোনো মানুষের পক্ষে প্রয়োজনীয় সব কিছু উৎপাদন করা সম্ভব নয়। একজনের যা রয়েছে, সে তা অন্যের সাথে বিনিময় করতে পারে, প্রতিটি মানুষকে এমন জিনিসের প্রয়োজন হতে পারে, যা তাকে তা ক্রয় করতে হয়। আল্লাহ মানুষকে পণ্য ও যে কোন সেবা পরস্পরের মাঝে ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে বিনিময় করাকে উৎসাহিত করেছেন। এটা এ জন্য যে, এ ধরনের লেনদেন আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা থাকে এবং মানুষকে উৎপাদনশীল কাজে উৎসাহিত করে।  আরবদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের লেনদেন ও বিনিময়ের প্রচলন ছিল। মহানবী (সা.) এসব লেনদেনের যেগুলো শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় সেগুলো অনুমোদন ও নিশ্চিত করেছেন, আর যেগুলো আংশিক বা পুরোপুরি শরিয়ার বিপরীত সে ধরনের চুক্তি নিষিদ্ধ করেছেন। এসব নিষিদ্ধ হওয়ার কতগুলো নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বেআইনি খাদ্যের ব্যবসা, প্রতারণানির্ভর লেনদেন, আত্মসাৎ বা অতিরিক্ত লাভ কিংবা চুক্তির যেকোনো পক্ষের প্রতি অবিচার ইত্যাদি। মুয়ামালাত মুয়াশারাত কি তা জেনেই আমরা এর সমাধান করতে পারি

মুয়ামালাতে যা নিষিদ্ধ : মুয়ামালাতের মধ্যে নিষিদ্ধ বিষয়গুলো হলো : কোনো নিষিদ্ধ পণ্য যেমনঃ মদ, শূকরের গোশত বা অন্য কোনো নিষিদ্ধ পদার্থ ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি করা যাবে না। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের আমি যে পবিত্র বস্তু দিয়েছি, তা থেকে আহার করো এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, আর তোমরা শুধু তাঁরই ইবাদত করো।’ (সুরা : বাকারা : ১৭২)

এ আয়াতটি এটাই নির্দেশ করে যে কোনো নিষিদ্ধ জিনিস বা বস্তু গ্রহণের অধিকার কোন মানুষের নেই।

সুদভিত্তিক চুক্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে : আল্লাহ তাআলা সুদকে নিষিদ্ধ করেছেন; মহান আল্লাহ বলেন,

اَلَّذِیۡنَ یَاۡکُلُونَ الرِّبٰوا لَا یَقُومُونَ اِلَّا کَمَا یَقُوۡمُ الَّذِیۡ یَتَخَبَّطُهُ الشَّیۡطٰنُ مِنَ الۡمَسِّ ذٰلِکَ بِاَنَّهُمۡ قَالُوۡۤا اِنَّمَا الۡبَیۡعُ مِثۡلُ الرِّبٰوا وَ اَحَلَّ اللّٰهُ الۡبَیۡعَ وَ حَرَّمَ الرِّبٰوا فَمَنۡ جَآءَهٗ مَوۡعِظَۃٌ مِّنۡ رَّبِّهٖ فَانۡتَهٰی فَلَهٗ مَا سَلَفَ وَ اَمۡرُهٗۤ اِلَی اللّٰهِ وَ مَنۡ عَادَ فَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ هُمۡ فِیۡهَا خٰلِدُوۡنَ

যারা সুদ নেয়, তারা তার ন্যায় উঠবে, যাকে শয়তান পাগল বানিয়ে দেয়। তা এই কারণেই যে, তারা বলে, ক্রয়-বিক্রয় সুদের মতই। অথচ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয় হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম। সুতরাং, যার কাছে তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে তা থেকে বিরত হল, যা অতীত হয়েছে তা তার জন্যই ইচ্ছাধীন, আর তার ব্যাপারটি আল্লাহর কাছে সুপর্দ। আর যারা না মেনে পিছনে ফিরে গেল, তারা জাহান্নামী। তারা চিরকাল সেখানেই থাকবে।  (সুরা : বাকারা : ২৭৫)

যেসব চুক্তির মধ্যে অনিশ্চয়তা বা ধোঁকার অস্তিত্ব থাকে তা নিষিদ্ধ এবং বড় ধরনের ধোঁকা বা অনিশ্চয়তা সম্পৃক্ত চুক্তি ত্রুটিপূর্ণ এবং বাতিল বলে গণ্য। যেসব বস্তুর কোনো ব্যবহার নেই বা মূল্য নেই তা উৎপাদন বা বিক্রয় করাও ইসলামে নিষিদ্ধ।

মুয়াশারাত কি?

আর মানুষের মুয়াশারাতের সমস্যা হলো, মামুষ নিজের বড় ত্রুটিগুলো দেখতেই পায় না কখনো, অথচ অন্যের ছোট ছোট দোষ তার খুজে বেড়ায়।

মুয়াশারাত তথা আচার আচরণ এবং কথাবার্তায় একজন মু’মিনকে কিভাবে শালীন হতে হবে সে ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন করেন-


وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا

‘মানুষের সাথে সুন্দরভাবে কথাবার্তা বলো।’ (সূরা বাকারা : ৮)

নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-


كُلُّ مَعْرُوفٍ صَدَقَةٌ، وَإِنَّ مِنَ الْمَعْرُوفِ أَنْ تَلْقَى أَخَاكَ بِوَجْهٍ طَلْقٍ.

প্রতিটি ভালো কাজ ছদাকা। আর গুরুত্বপূর্ণ একটি ভালো কাজ হল, অপর ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা। -জামে তিরমিযী : ১৯৭০
অন্য হাদীসে নবী (সা.) বলেন:


تَبَسُّمُكَ فِي وَجْهِ أَخِيكَ لَكَ صَدَقَةٌ.

তোমার ভাইয়ের (সাক্ষাতে) মুচকি হাসাও একটি ছদাকা। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৫৬’। -তিরমিযী ৩

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ مَا نَهَى اللهُ عَنْهُ

‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সে-ই মুসলিম, যার জিহবা ও হাত হতে সকল মুসলিম নিরাপদ এবং সে-ই প্রকৃত মুহাজির, আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা যে ত্যাগ করে। (৬৪৮৪; মুসলিম ১/১৪ হাঃ ৪০, আহমাদ ৬৭৬৫)

ফাতহুল বারি কিতাবে এ হাদিসের ব্যাখ্যায় এসেছে যে, ‘জিহবা থেকে নিরাপদ থাকা মানে’, কাউকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা, কাউকে অপবাদ দেয়া, গালিগালাজ ইত্যাদি গর্হিত কাজ করা। আর ‘হাত থেকে নিরাপদ’ মানে মারধর করা, অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে নিয়ে নেয়া বা ভোগ করা।

عَنْ أَبِي حَمْزَةَ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ خَادِمِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه و سلم عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه و سلم قَالَ: “لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ”.

আবূ হামযাহ্ আনাস ইবনু মালেক রাদিয়াল্লাহু ’আনহু-রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লামের খাদেম-হতে বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।”  [বুখারী: ১৩, মুসলিম: ৪৫] । মুসনাদে আহমাদে এ হাদিসের বিশদ বিবরণ রয়েছে। রাসুল (সা.) সাহাবাদের বললেন, তোমারা তোমাদের ভাইয়ের জন্য সেটিই পছন্দ করো যা তোমরা নিজের জন্য পছন্দ করেছো।

লোকমান (আ.) তার ছেলেদের যেসব নসিহত করেছিলেন:

وَ لَا تُصَعِّرۡ خَدَّکَ لِلنَّاسِ وَ لَا تَمۡشِ فِی الۡاَرۡضِ مَرَحًا ؕ اِنَّ اللّٰهَ لَا یُحِبُّ کُلَّ مُخۡتَالٍ فَخُوۡرٍ ۝  وَ اقۡصِدۡ فِیۡ مَشۡیِکَ وَ اغۡضُضۡ مِنۡ صَوۡتِکَ ؕ اِنَّ اَنۡکَرَ الۡاَصۡوَاتِ لَصَوۡتُ الۡحَمِیۡرِ ۝

আর তুমি মানুষদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। আর যমিনে অহংকার করে চলাফেরা কর না; নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিক,অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না। আর তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন কর, তোমার গলার আওয়াজ নীচু করো; নিশ্চয় সবচেয়ে নিকৃষ্ট আওয়াজ হলো গাধার ডাক -(সূরা লোকমান ১৮-১৯)।

আমাদের আচার-আচরণগুলো সব এমনই হওয়া উচিত। নবী (সা.) বলেছেন,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম, আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার স্ত্রীদের নিকট সর্বোত্তম ব্যক্তি”। (ইবনে মাজাহ : ১৯৭৭)

অধস্তন কাউকে সব সময় মাফ করে দেয়া। এ কথা শুনে কোন এক সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.), আমি আমার কর্মচারীকে কতবার ক্ষমা করবো। নবী (সা.) উত্তরে বললেন, ‘দৈনিক সত্তরবার’ (তিরমিযী)।

নবী কারিম (সা.)-এর নির্দেশনা দিয়েছেন, রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। খুব বেশি রাগ উঠে গেলে চুপ করে থাকো কিংবা অজু করে নাও -(মুসনাদে আহমাদ ও আবু দাউদ শরিফ)।

নবী মানুষকে মুয়াশারাত শেখাতে গিয়ে বলেছেন, মানুষের সঙ্গে দেখা করে একটি মুচকি হাসি দাও। ভালো কাজের পরামর্শ দাও, খারাপ কাজে বাধা প্রদান কর। পথহারাকে পথ দেখিয়ে দাও। রাস্তার পাথর, কাঁটা, হাড্ডি ইত্যাদি কষ্টদায়ক জিনিস থাকলে সরিয়ে দাও। নিজের বালতি থেকে কোনো ভাইয়ের বালতিতে পানি ঢেলে দাও (তিরমিযী)।

যে কেউ কারও প্রয়োজন মিটিয়ে দেয়, আল্লাহ সোবহানুহু তাআলা তার প্রয়োজন মিটিয়ে দেবেন (আবু দাউদ)।

তাছাড়া মানুষের দোষ-ত্রুটি বলে বেড়াবে না। যে মানুষের দোষ-ত্রুটি গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলা তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখেন -(মুসনাদে আহমাদ)।

নবী কারিম (সা.) তিনটি জিনিস কেউ চাইলে অবশ্যই তাকে তা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, কাউকে ফিরিয়ে দেয়া থেকে নিষেধ করেছেন। (১)- বালিশ। (২). খুশবু অথবা আতর-সুগন্ধি। (৩). দুধ। (তিরমিযী)

কেউ যদি হাদিয়া হিসেবে ফুল দেয় তাহলে তাও ফিরিয়ে দেয়া যাবে না। (মুসলিম)

তিন দিনের বেশি কারও সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে রাখা যাবে না। (আবু দাউদ)

 আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না। এতিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে হবে এবং মিসকিনকে খানা খাওয়াতে হবে। (মুসনাদে আহমাদ)

যে ব্যক্তি নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার পাশে বসবাসকারী ক্ষুধার্ত থাকে, সে কখনো মোমিন হতে পারে না। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে এ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। আর এটি সংকলিত হয়েছে আবু ইয়ালায় (রা)। এভাবে প্রতিবেশীর মর্যাদা ও জিম্মাদারীকে নবী (সা.) খুব বড় করে দেখেছেন। অন্য এক জায়গায় বলেছেন, যদি প্রতিবেশী কিছু চায়, তবে তাকে তা দাও। প্রতিবেশী দাওয়াত দিলে যাও। সে অসুস্থ হয়ে গেলে দেখতে যাও। যদি সে মারা যায়, তাহলে তার জানাজায় যাও। প্রতিবেশী বিপদে পড়লে তাকে সান্ত্বনা দাও। অভাবী প্রতিবেশীর কাছে থেকে যদি গোশত রান্না করো, তহলে কিছু তার কাছে পাঠাও, না পারলে সামান্য জুল হলেও পাঠাও। তুমি এমন করে দালান-ইমারত বানাবে না, যাতে প্রতিবেশীর ঘরে বাতাস যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় (তারগিব)।

আমরা কোরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে মুয়ামালাত মুয়াশারাত কি তা আমরা আলাদা আলাদা ভাবে আলোচনা করেছি

মুয়ামালাত মুয়াশারাত কি তা আমরা জানলাম বস্তুত মুয়ামালাত ও মুয়াশারাত ইসলামি আদর্শে এমন একটি বিষয় যা একজন মুসলিমকে সতত নেকপথে চলতে সাহায্য করে। আল্লাহর এবাদত কম করলে আল্লাহ হয়তো তা মাফ করে দেবেন। কিন্তু মুয়ামালাত-মুয়াশারাত বান্দার হক, মানুষের হক, আল্লাহ তাআলা এখানে তার কর্তৃত্ব রাখেন নি, বরং আল্লাহ বান্দার হক বান্দার কাছেই ক্ষমার জিম্মা রেখেছেন। প্রতিটি মানুষকে তার লেনদেন আর আচার-ব্যবহারের জন্য বান্দার কাছেই কৈফিয়ত দিতে হবে। সে যদি জিহাদে গিয়ে একজন শহীদও হন তবুও, এর সমাধান না করে জান্নাতে যেতে পারবেন না । অন্যদের অবস্থা তাহলে কী হবে! আল্লাহ আমাদেরকে মাফ করুন। আমিন