নামাজ ভঙ্গের কারণসমূহ

আজকে আমরা জানবো নামাজ ভঙ্গের কারণসমূহ কি কি, তবে তার আগে জেনে নেওয়া উচিৎ যে আমরা যদি নামাজ ভঙ্গের কারণসমূহ না জানি তাহলে আমাদের নামাজ হয়েছে কিনা? বা আমাদের নামাজ আবার পড়তে হবে কিনা আমরা তা কখনো জানতে পারবো না। নামাজ ইসলাম ধর্মের একটি দৈনিক নিয়মিত ইবাদত। একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নামাজ আদায় করতে হয়, তাই নামাজে কোন ধরণের ভুল হলে আমাদের ইবাদাত কবুল হবে না।

এক নজরে নামাজ ভঙ্গের কারণসমূহ

০১* নামাযে অশুদ্ধ পড়া। 
০২* নামাযের ভিতর কথা বলা। 
০৩* কোন লোককে সালাম দেওয়া। 
০৪*  সালামের উত্তর দেওয়া। 
০৫*  উহঃ আহঃ শব্দ করা। 
০৬*  বিনা উযরে কাশি দেওয়া। 
০৭*  আমলে কাছীর করা। 
০৮*  বিপদে কি বেদনায় শব্দ করিয়া কাদা। 
০৯*  তিন তাসবীহ পরিমাণ সময় সতর খুলিয়া থাকা। 
১০* মুক্তাদি ব্যতীত অপর ব্যক্তির লুকমা নেওয়া। 
১১* সুসংবাদ ও দুঃসংবাদের উত্তর দেওয়া। 
১২* নাপাক জায়গায় সিজদা করা। 
১৩* ক্বিবলার দিক হইতে সীনা ঘুরিয়া যাওয়া। 
১৪* নামাযে কুরআন শরীফ দেখিয়া পড়া। 
১৫* নামাযে শব্দ করিয়া হাসা। 
১৬* নামাযে দুনিয়াবী কোন কিছুর প্রার্থনা করা। 
১৭* হাচির উত্তর দেওয়া। 
১৮* নামাযে খাওয়া ও পান করা। 
১৯* ইমামের আগে মুক্তাদী খাড়া হওয়া।

বিস্তারিত ও দলিলসহ নামাজ ভঙ্গের কারণসমূহ

০১* নামাযে অশুদ্ধ পড়া। “নামাজের ভেতর কিরাতে যদি এমন পরিবর্তন হয়, যার ফলে কুরআনের অর্থ ও উদ্দেশ্য আংশিক বা সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যায়, তাহলে নামাজ ভেঙে যাবে। আবার তা আদায় করা ওয়াজিব হবে।” (ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী : ১/৮০, ফাতাওয়ায়ে শামী : ১/৬৩৩-৬৩৪)

০২*  নামাযের ভিতর কথা বলা। “নামাজে এমন কোনো শব্দ করা, যা সাধারণ কথার অন্তর্ভুক্ত হয়। তাহলে নামাজ ভেঙে যাবে” ( আল বাহরুর রায়েক : ২/২, ফাতাওয়ায়ে শামী : ১/৬১৩)

০৩*  কোন লোককে সালাম দেওয়া। “নামাজ পড়া অবস্থায় কাউকে সালাম দিলে নামাজ ভেঙে যায়”  (ফাতাওয়ায়ে শামী : ২/৯২, আল বাহরুর রায়েক : ২/১২০)

০৪*  সালামের উত্তর দেওয়া। নামাজে কারো সালামের উত্তর দেওয়া হলে নামাজ ভেঙ্গে যায়। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে তাঁর একটি কাজে পাঠিয়ে ছিলেন আমি কাজে গেলাম এবং কাজ থেকে ফিরে আসলাম। অতঃপর নবী কারিম (সা.)-কে সালাম করলাম। তিনি উত্তর দেননি। এতে আমার মনে এমন সন্দেহ লাগল, যা আল্লাহই ভালো জানেন, আমি মনে মনে বললাম, সম্ভবত আমি বিলম্বে আসার কারণে নবী (সা.) আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে আছেন। আবার আমি তাঁকে সালাম দিলাম; তিনি উত্তর দিলেন না। ফলে আমার মনে প্রথমবারের চেয়েও অধিক সন্দেহ লাগল। (নামাজ শেষ হলে) আবার আমি তাঁকে সালাম দিলাম। এবার তিনি সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন, ‘নামাজে ছিলাম বলে তোমার সালামের উত্তর দিতে পারিনি। তিনি তখন তাঁর বাহনের পিঠে কিবলা থেকে অন্য মুখে ছিলেন।’” (বুখারি : ১২১৭)

০৫* উহঃ আহঃ শব্দ করা। “নামাজ পড়া অবস্থায় কোনো কষ্ট কিংবা দুঃখের কারণে কোন শব্দ করলে নামাজ ভেঙে যাবে।” (আদ্দুররুল মুখতার : ১/৬১৯, আল-বাহরুর রায়েক : ২/৪, মারাকিল ফালাহ : ১/১২১)

০৬*  বিনা উযরে কাশি দেওয়া।  “অপ্রয়োজনে কাশি দেওয়ার দ্বারাও নামাজ ভেঙে যায়” (ফাতাওয়ায়ে শামী : ৩/৬১৮, মারাকিল ফালাহ : ১/১২১, আল-বাহরুর রায়েক : ২/৫)

০৭*  আমলে কাছীর করা। “আলেমগণ গণ আমলে কাসিরের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিভিন্ন মত ব্যক্ত করেছেন। তার মধ্যে নির্ভরযোগ্য মত হলো, কোনো নামাজরত ব্যাক্তি এমন কাজে লিপ্ত থাকা, যার কারণে দূর থেকে কেউ দেখলে তার মনে ধারণা জন্মে যে ওই ব্যক্তি নামাজরত নয়।” (ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত : ৩/৪৮৫, ফাতাওয়ায়ে শামী : ১/৬২৪-৬২৫, বায়েউস সানায়ে : ১/২৪১)

০৮* বিপদে কি বেদনায় শব্দ করিয়া কাদা। “দুনিয়াবি কোনো বিপদ-আপদ কিংবা দুঃখের কারণে শব্দ করে কাঁদলে নামাজ ভেঙে যায়।”  (হাশিয়াতু তাহতাবি : ১/৩২৫, ফাতাওয়ায়ে শামী : ১/৬১৯, নূরুল ইজাহ, পৃ. : ৬৮)

মজলিসে শুরা কি

০৯*  তিন তাসবিহ পরিমাণ সময় সতর খুলিয়া থাকা। “নাভির নিচ থেকে শুরু করে হাটু পর্যন্ত শরিরের কোনো অঙ্গ যদি তিন তাসবিহ পাঠ করার সময় পরিমাণ খোলা থাকে, তাহলে নামাজী ব্যক্তির নামাজ ভেঙ্গে যাবে, সুতরাং যদি কোনো ব্যক্তির গেঞ্জী অথবা শার্ট , পানজাবী, পায়জাম কিংবা প্যান্ট নাভির নিচ থেকে রুকু বা সিজদার সময় সরে যায়, আর সময় যদি তিন তাসবিহ পরিমাণ হয়, তাহলে নামাজ ভেঙে যাবে।” (ফাতওয়ায়ে শামী : ১/২৭৩, মাওয়াহিবুল জলীল : ১/৩৯৮)

“নারীদের মাথা সহ পুরো শরীর, সতর। হাতের কব্জি বা পায়ের টাকনু পর্যন্ত, আর মুখমন্ডল সতরের অন্তরভোক্ত নয়। কোনো কারণে মাথার ওড়না সরে গেলেও নামাজ ভেঙে যাবে। রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন,  ‘কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী ওড়না ছাড়া নামাজ আদায় করলে আল্লাহ তার নামাজ কবুল হবে না।’ ” (আবু দাউদ : ৬৪১, তিরমিজি : ৩৭৭, ইবনে মাজাহ : ৬৫৫)

১০* মুক্তাদি ব্যতীত অপর ব্যক্তির লুকমা নেওয়া। “ইমাম সাহেব নামাজে কোন ভুল করলে, নামাজের বাইরের কোনো ভুল ধরলে, ইমাম সাহেব তা গ্রহণ করলে নামাজ ভেঙ্গে যাবে” (ফাতাওয়ায়ে শামী : ১/৬২২, ফাতাওয়ায়ে আলগীরী : ১/৯৮)

১১* সুসংবাদ ও দুঃসংবাদের উত্তর দেওয়া। “নামাজে কোন ধরণের সুসংবাদ কিংবা দুঃসংবাদের উত্তর দেওয়া দুনিয়াবী কথার অন্তরভুক্ত হয়, তাই এই কারণে নামাজ ভেঙে যায়।” (ফাতাওয়ায়ে শামী : ১/৬১৩, আল বাহরুর রায়েক : ২/২)

১২* নাপাক জায়গায় সিজদা করা। “নামাজ পড়ার জায়গাটা পবিত্র হওয়া খুবই জরুরি। মানে নামাজের সময় নামাজীর শরীর যে জায়গা স্পর্শ করে, সে জায়গা পবিত্র হওয়া, যা নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য জরুরী, তাই নাপাক কিংবা অপবিত্র জায়গায় সিজদা করলে নামাজ ভেঙে যাবে।” (তাবয়ীনুল হাকায়েক : ১/৯৫, বাদায়েউস সানায়ে : ১/১১৫, আল বাহরুর রায়েক : ২/৩৭)

১৩* ক্বিবলার দিক হইতে সীনা ঘুরিয়া যাওয়া। “কোনো কারণে কিবলার দিক থেকে বুক ঘুরে গেলে নামাজ ভেঙে যায়। তবে যানবাহনে নামাজের ক্ষেত্রে ভিন্ন।”  (মারাকিল ফালাহ ১/১২১, নূরুল ঈজাহ ১/৬৮)

১৪* নামাযে কুরআন শরীফ দেখিয়া পড়া। “নামাজরত অবস্থায় কুরআন শরিফ দেখে দেখে পড়লে নামাজ ভেঙে যায়।” (মারাকিল ফালাহ : ১/১২৪, হাশিয়াতুত তাহতাবি : ১/৩৩৬) তবে অন্য মাজহাবে এ মাসআলার ক্ষেত্রে ভিন্নমত।

১৫* নামাযে শব্দ করিয়া হাসা। “নামাজে শব্দ করে অট্টহাসি দিলে ওজুসহ ভেঙে যায়।” (কানযুদ্দাকায়েক : ১/১৪০)

১৬* নামাযে দুনিয়াবী কোন কিছুর প্রার্থনা করা। “নামাজরত সাংসারিক/দুনিয়াবি কোনো দোয়া করলে হানাফি মাজহাব মতে নামাজ ভেঙে যায়।” (ফাতাওয়ায়ে শামী : ১/৬১৯, আল বাহরুর রায়েক : ২/৩)। তবে এ মাসআলার ক্ষেত্রে অন্য মাজহাবের ভিন্নমত আছে।

হাফেজী কুরআন শরীফ

১৭* হাচির উত্তর দেওয়া। “নামাজ পড়া অবস্থায় কারো হাসির (উত্তরে ইয়ারহামুকাল্লাহ বললে) উত্তর দেওয়া কথা বলার নামান্তর। এর দ্বারা নামাজ ভেঙে যায়।” (ফাতাওয়ায়ে শামী : ২/১১৭)

১৮* নামাযে খাওয়া ও পান করা। নামাজ পড়া অবস্থায় কিছু খেলে বা পান করলে নামাজ ভেঙে যাবে। দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাবারেও নামাজরত অবস্থায় খেলে নামাজ ভেঙে যাবে। -(মারাকিল ফালাহ : ১/১২১, নূরুল ঈজাহ : ১/৬৮)

১৯* ইমামের আগে মুক্তাদী খাড়া হওয়া। “মুক্তাদির পায়ের গোড়ালি ইমামের আগে চলে গেলে নামাজ ভেঙে যায়। তবে যদি মুক্তাদি ইমামের পায়ের গোড়ালির পেছনেই দাঁড়ায়, কিন্তু তিনি লম্বা হওয়ার কারণে তাঁর সিজদা ইমামকে অতিক্রম করে যায়, তাহলে নামাজের কোনো ক্ষতি হবে না।” (বাদায়েউস সানায়ে : ১/১৫৯, আল মাবসুত লিস সারাখসি : ১/৪৩)

এই ১৯টি ছাড়াও নামাজ ভঙ্গ হওয়ার আরো কারণ রয়েছে, যেমন— কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী পাশে এসে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলে, ইমামের আগে কোনো রোকন আদায় করে ফেলা, ওজু ভাঙার মতো কোনো কাজ করা, পাগল, মাতাল কিংবা অচেতন হয়ে যাওয়া ইত্যাদি নামাজ ভঙ্গের কারণ।