পর্দা সম্পর্কে আয়াত ও হাদিস

কুরআনে কারীমের পর্দা সম্পর্কে আয়াত ও হাদিস দ্বারা জানা যায় যে, ইসলামী শরীয়তে মূল মাকসাদ এমন পর্দা, যার দ্বারা মহিলাদের চলাফেরা, তার পোশাক, তার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের কিছুই পর পুরুষের দৃষ্টিগোচর যাতে না হয়।

এমন পর্দা পালন করা পর্দাবৃত বাড়ি-ঘর ও সংশ্লিষ্ট পর্দার মাধ্যমেই সম্ভব। এটাই নারীদের জন্য আসল স্থান তথা নিজ ঘর। এটিই পর্দার প্রথম স্তর, যা পবিত্র কুরআন শরীফে স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে:

পর্দা সম্পর্কে কিছু আয়াত

وَ قَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَ لَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاهِلِیَّۃِ الۡاُوۡلٰی وَ اَقِمۡنَ الصَّلٰوۃَ وَ اٰتِینَ الزَّکٰوۃَ وَ اَطِعۡنَ اللّٰهَ وَ رَسُوۡلَه اِنَّمَا یُرِیۡدُ اللّٰهُ لِیُذهِبَ عَنۡکُمُ الرِّجۡسَ اَهۡلَ الۡبَیۡتِ وَ یُطَهِّرَکُمۡ تَطهِیۡرًا

আর তোমরা নিজের ঘরে অবস্থান করো এবং জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। আর তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা করো, যাকাত আদায় করো এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো। হে নবী পরিবার! আল্লাহ শুধু চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণ পবিত্র করতে। -(সূরা আহযাব-৩৩)

 یٰۤاَیُّهَا الَّذِینَ اٰمَنُوا لَا تَدخُلُوا بُیُوتَ النَّبِیِّ اِلَّاۤ اَن یُّؤۡذَنَ لَکُم اِلٰی طَعَامٍ غَیرَ نٰظِرِیۡنَ اِنٰىهُ وَ لٰکِن اِذَا دُعِیۡتُمۡ فَادۡخُلُوا فَاِذَا طَعِمۡتُمۡ فَانۡتَشِرُوۡا وَ لَا مُسۡتَاۡنِسِیۡنَ لِحَدِیۡثٍ اِنَّ ذٰلِکُمۡ کَانَ یُؤۡذِی النَّبِیَّ فَیَسۡتَحۡیٖ مِنۡکُمۡ وَ اللّٰهُ لَا یَسۡتَحۡیٖ مِنَ الۡحَقِّ و اِذَا سَاَلۡتُمُوۡهُنَّ مَتَاعًا فَسۡـَٔلُوۡهُنَّ مِن وَّرَآءِ حِجَابٍ ذٰلِکُمۡ اَطۡهَرُ لِقُلُوۡبِکُمۡ وَ قُلُوۡبِهِنَّ و مَا کَانَ لَکُمۡ اَنۡ تُؤۡذُوۡا رَسُولَ اللّٰهِ وَ لَاۤ اَنۡ تَنۡکِحُوۡۤا اَزۡوَاجَهٗ مِنۡۢ بَعۡدِهٖۤ اَبَدًا اِنَّ ذٰلِکُمۡ کَانَ عِنۡدَ اللّٰهِ عَظِیۡمًا۝

হে মুমিনগণ! তোমরা নবী গৃহে প্রবেশ করো না অবশ্যই যদি তোমাদেরকে খাবারের জন্য অনুমতি দেয়া হয় তাহলে (গৃহে প্রবেশ করো) খাবারের প্রতিশ্রুতির জন্য অপেক্ষা না করে। আর যখন তোমাদেরকে (ঘরে) ডাকা হবে তখন তোমরা প্রবেশ করো এবং খাওয়া দাওয়া শেষ হলে চলে যাও আর কথাবার্তায় লিপ্ত হয়ো না, কারণ তা নবীর জন্য কষ্টদায়ক, তিনি তোমাদের বিষয়ে সঙ্কোচ বোধ করেন; কিন্তু আল্লাহ তাআলা সত্য প্রকাশে সঙ্কোচ বোধ করেন না। আর যখন নবীর স্ত্রীদের কাছে তোমরা কোন সামগ্রী চাইবে তখন পর্দার আড়াল থেকেই চাইবে; এটি তোমাদের ও তাঁদের অন্তরের জন্য অধীকতর পবিত্র, আর আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেওয়া এবং তার (ইন্তেকালের) পর তার স্ত্রীদেরকে বিয়ে করা কখনো তোমাদের জন্য সমিচিন নয়। নিশ্চয় এটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত গুরুতর গোনাহ। -(সূরা আহযাব-৫৩)

ইমাম কুরতুবী (রাহ) উক্ত আয়াতের আলোচনায় বলেন, এই আয়াতে আল্লাহ রাসূল (সা.)-এর স্ত্রীদের কাছে কোনো প্রয়োজনে পর্দার আড়াল হতে কিছু চাওয়া কিংবা কোনো মাসআলা (তথা কোন শরীয়তের বিধান) জিজ্ঞাসা করার অনুমতি দিয়েছেন। সাধারণ নারীগণও এই হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। -(তাফসীরে কুরতুবী ১৪/১৪৬)

নবী করীম (সা)-এর স্ত্রীগণ হলেন সকল মুমিনের মা। অথচ তাঁদের সাথেই লেনদেন বা কথা-বার্তা বলতে হলে পর্দার আড়াল থেকে করতে বলা হয়েছে। তাহলে অন্যান্য নারীদের ক্ষেত্রে হুকুমটি কত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত তা তো সহজেই বুঝা যায়।

লক্ষ করার বিষয় হলো, প্রথম আয়াতের মাঝে মহিলাদের ঘর থেকে বের হতেই নিষেধ করা হয়েছে, প্রয়োজন ছাড়া আর দ্বিতীয় আয়াতে যদি কোন পর পুরুষের মহিলাদের কাছে কোন চাওয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে পর্দার আড়াল থেকে চাওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পর্দা সম্পর্কে আয়াত: পর্দার পরিমাণ কতটুকু?

 یٰۤاَیُّهَا النَّبِیُّ قُلۡ لِّاَزۡوَاجِکَ وَ بَنٰتِکَ وَ نِسَآءِ الۡمُؤمِنِیۡنَ یُدۡنِیۡنَ عَلَیۡهِنَّ مِن جَلَابِیبِهِنَّ ذٰلِکَ اَدنٰۤی اَنۡ یُّعرَفنَ فَلَا یُؤۡذَیۡنَ وَ کَانَ اللّٰهُ غَفُورًا رَّحِیۡمًا ۝

হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে, কন্যাদেরকে ও মুমিনদের নারীদেরকে বল, ‘তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের উপর ঝুলিয়ে দেয়, তাদেরকে চেনার ব্যাপারে এটাই সবচেয়ে কাছাকাছি পন্থা হবে। ফলে তাদেরকে কষ্ট দেয়া হবে না। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আহযাব-৫৯)

এ আয়াতে আল্লাহ মহিলাদের জন্য ঘর থেকে বের হওয়ার পদ্ধতি আলোচনা করেছেন। কোন প্রয়োজনীয় কারণে ঘর থেকে বের হওয়ার সময়ও পর্দাহীন হওয়া যাবে না। বরং সে সময়ও স্বীয় চেহারার উপর পর্দা টেনে নিতে হবে। যাতে করে চেহারা কারো দৃষ্টিগোচর না হয়।

মুয়ামালাত মুয়াশারাত কি

উক্ত আয়াতের কারণেই মুখ ঢেকে রাখা মুসলিম নারীদের উপর ফরজ হয়। এর বিপরীত করা জায়েজ নেই।

পর্দা পরপুরুষের সাথে হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সৌন্দর্যমন্ডিত বস্তুও লুকানোও ফরজ।

وَقُل لِلمُؤمِنَاتِ يَغْضُضنَ مِن أَبْصَارِهِن وَيَحفَظنَ فُرُوجَهُن وَلَا يُبدينَ زِينتهُنَّ إلَّا ما ظَهرَ مِنهَا وَليَضرِبنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلى جُيُوبِهِنَ

ঈমানদার নারিদেরকে আপনি বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে আর তাদের যৌনাঙ্গ (গুনাহের কাজ থেকে) হেফাজত রাখে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান,(যেমন মুখ, হাত, পা) তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বুকে দিয়ে রাখে -(সূরা নূর-৩১)

এ আয়াতে স্পষ্টভাষায় সৌন্দর্যকে লুকাতে আদেশ দেয়া হয়েছে। যেটা হল পর্দা করার মূল উদ্দেশ্য।

কিন্তু যা সাধারণতঃ প্রকাশমান বলে চেহারা ও হাত উদ্দেশ্য করা হয়েছে। যা তীব্র প্রয়োজনের সময় যেমন: প্রচন্ড ভীর, আদালতে সাক্ষ্য প্রদান ইত্যাদি প্রয়োজনে খোলা জায়েজ আছে।

এ দুটি বিষয় পৃথক করা হয়েছে সতর থেকে। কিন্তু পর্দা থেকে নয় পৃথক করা হয়নি। অর্থাৎ এ দুটি অংগ সতরের অন্তর্ভূক্ত না, কিন্তু পর্দার অন্তর্ভূক্ত। এ কারণেই নামাযের সময় হাত, মূখ ও পা ঢাকার প্রয়োজন হয় না। এসব খুলা রেখেই নামায হয়ে যায়। কারণ এসব সতর নয়। তাছাড়া নামাযে সতর ঢাকা ফরজ।

পর্দা সম্পর্কে হাদিস

عَنْ عَبْدِ الْخَبِيرِ بْنِ ثَابِتِ بنِ قَيْسِ بْنِ شَمَّاسٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ قَالَ : جَاءَتِ امْرَأَةٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقَالُ لَهَا أُمُّ خَلَّادٍ وَهِيَ مُنْتَقِبَةٌ تَسْأَلُ عَنِ ابْنِهَا وَهُوَ مَقتُولٌ فَقَالَ لَهَا بَعضُ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى الله عَلَيهِ وَسَلَّمَ جِئتِ تَسْأَلِينَ عَنِ ابنِكِ وَأَنتِ مُنْتَقِبَةٌ؟ فَقَالَتْ إِنْ أُرْزَأ ابْنِي فَلَنْ أُرزَأَ حَيَائِي

হযরত আব্দুল খায়ের বিন সাবেত বিন কায়েস বিন শাম্মাস তার পিতা, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, একদা এক মহিলা রাসূল সাঃ এর কাছে আসলেন। যাকে উম্মে খাল্লাদ বলা হতো । তিনি এমতাবস্থায় আসলেন যে, তার চেহারা পর্দাবৃত ছিল। সে এসে তার নিহত সন্তানের ব্যাপারে অভিযোগ জানায়। তখন কতিপয় সাহাবী তাকে বললেন, “তুমি তোমার ছেলের ব্যাপারে অভিযোগ দাখিল করতে এসেছে, তারপরও তুমি পর্দাবৃত হয়ে এলে?” তখন উম্মে খাল্লাদ বলেন: যদিও আমার ছেলের উপর বিপদ-আপদ এসেছে, এর মানেত এটা নয় যে আমার লজ্জা শরমেরও বিপদ আসেনি। -(সুনানে আবু দাউদ : ২৪৮৮)

عَن عَبدِ اللهِ عَنِ النَّبِي صَلَّى الله عَلَيْه وَسَلَّمَ قَالَ الْمَرأَةُ عَورَةٌ فَإِذَا خَرَجَتْ استَشرَفَهَا الشَّيطَانُ

হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসঈদ রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল রাসূল সাঃ বলেছেন, মহিলা জাতি হল আপাদমস্তক সতর। যখন সে বের হয়, তখনি শয়তান তাকে চমৎকৃত করে তোলে। (সুনানে তিরমিজী : ১১৭৩, মুসনাদুল বাজ্জার : ২০৬৫, সহীহ ইবনে খুজাইমা : ১৬৮৫, সহীহ ইবনে হিব্বান : ৫৫৯৮)

عَنْ عَائِشَةَ : أَنَّهَا كَانَتْ تَطُوفُ بِالْبَيتِ وَهِيَ مُنْتَقِبَةً

হযরত আয়শা সিদ্দিকা রাঃ বাইতুল্লাহ তওয়াফ করতেন পর্দাবৃত অবস্থায়। (মুসন্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস নং-৮৮৫৯)

hifz/hafizi quran-15 lines