রোজা সম্পর্কে কুরআনের আয়াত আরবি

রমযনের রোযা ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। ঈমান, নামায ও যাকাতের পরই রোযার স্থান। রোযার আরবি শব্দ সওম, যার আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। পরিভাষায় সওম বলা হয়-প্রত্যেক সজ্ঞান, বালেগ মুসলমান নর-নারীর সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়তে পানাহার, স্ত্রী সহবাস ও রোযাভঙ্গকারী সকল কাজ থেকে বিরত থাকা। সুতরাং রমযান মাসের চাঁদ উদিত হলেই প্রত্যেক সুস্থ, মুকীম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং হায়েয-নেফাসমুক্ত প্রাপ্তবয়স্কা নারীর উপর পূর্ণ রমযান রোযা রাখা ফরয।তাই আমরা আজ রোজা সম্পর্কে কুরআনের আয়াত আরবি নিয়ে আলোচনা করবো।

এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا كُتِبَ عَلَیْكُمُ الصِّیَامُ کَمَا كُتِبَ عَلَی الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ ۝اَیَّامًا مَّعْدُوْدٰتٍ فَمَنْ کَانَ مِنْكُمْ مَّرِیْضًا اَوْ عَلٰی سَفَرٍ فَعِدَّۃٌ مِّنْ اَیَّامٍ اُخَرَ وَعَلَی الَّذِیْنَ یُطِیْقُوْنَهٗ فِدْیَۃٌ طَعَامُ مِسْکِیْنٍ فَمَنْ تَطَوَّعَ خَیْرًا فَهُوَ خَیْرٌ لَّهٗ وَ اَنْ تَصُوْمُوْا خَیْرٌ لَّكُمْ  اِنْ كُنْتُمْ  تَعْلَمُوْنَ ۝

‘হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো। নির্দিষ্ট কয়েক দিন। তবে তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ, কিংবা সফরে থাকবে, তাহলে অন্যান্য দিনে সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আর যাদের জন্য তা কষ্টকর হবে, তাদের কর্তব্য ফিদয়া- একজন দরিদ্রকে খাবার প্রদান করা। অতএব যে স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত সৎকাজ করবে, তা তার জন্য কল্যাণকর হবে। আর সিয়াম পালন তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জান। (সুরা বাকারা : ১৮৩-১৮৪)

রোজা ইসলামের তৃতীয় ফরজ বিধান। আল্লাহ রমজান মাসজুড়ে রোজা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে রোজাদারের জন্য আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন; তাহলো- ‘দিনের বেলায় হালাল বস্তু খাওয়া ও পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আবার স্বামী-স্ত্রীও মেলামেশা থেকেও বিরত থাকবে।’ এমনকি যারা রমজান মাসে ইতেকাফ করবে; সেসব স্বামী-স্ত্রীও মেলামেশা করতে পারবে না। এসবই আল্লাহর নির্দেশ।

রোজা সম্পর্কে কুরআনের আয়াতে নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা কোরআনে রমজান মাসে যেমন রোজা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন তেমনি রোজায় করণীয় কী হবে তাও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। রোজার নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ ঘোষণা দেন-

شَهۡرُ رَمَضَانَ الَّذِیۡۤ اُنۡزِلَ فِیۡهِ الۡقُرۡاٰنُ هُدًی لِّلنَّاسِ وَ بَیِّنٰتٍ مِّنَ الۡهُدٰی وَ الۡفُرۡقَانِ فَمَنۡ شَهِدَ مِنۡکُمُ الشَّهۡرَ فَلۡیَصُمۡهُ وَ مَنۡ کَانَ مَرِیۡضًا اَو عَلٰی سَفَرٍ فَعِدَّۃٌ مِّنۡ اَیَّامٍ اُخَرَ یُرِیۡدُ الله بِکُمُ الۡیُسۡرَ و لَا یُرِیۡدُ بِکُمُ الۡعُسۡرَ و لِتُکۡمِلُوا الۡعِدَّۃَ وَ لِتُکَبِّرُوا اللّٰهَ عَلی مَا هَدٰىکُمۡ وَ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ

রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে। আর যে অসুস্থ হবে অথবা সফরে থাকবে তবে অন্যান্য দিবসে সংখ্যা পূরণ করে নেবে। আল্লাহ তোমাদের সহজ চান এবং কঠিন চান না। আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূরণ কর এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন, তার জন্য আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা কর এবং যাতে তোমরা শোকর কর। (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৫)

রমজান মাস। এ মাস পেলেই মুমিন মুসলমানের জন্য রোজা রাখা আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। কোরআনুল কারিমে তিনি এ ঘোষণাই দিয়েছেন- সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে’

আল্লাহ তাআলা কোরআনে এ আয়াত নাজিল করার মাধ্যমে সেই ফিদইয়া দেওয়ার বিধান রহিত করে দেন। রোজা পালনকে ঈমানদারদের জন্য আবশ্যক করে দেন।

এমনিভাবে কোনো কোনো সাহাবি গভীর রাতে ঘুম ভাঙার পরে স্ত্রীদের সঙ্গে সহবাসে লিপ্ত হয়ে, মানসিক কষ্টে পড়ে যান, তাই এই আয়াত নাজিল হয়। যাতে পুরাতন হুকুম বাধ দিয়ে নতুন করে-

اُحِلَّ لَکُمۡ لَیۡلَۃَ الصِّیَامِ الرَّفَثُ اِلی نِسَآئِکُمۡ هُنَّ لِبَاسٌ لَّکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ لِبَاس لَّهُنَّ عَلِمَ الله اَنَّکُمۡ کُنۡتُمۡ تَخۡتَانُوۡنَ اَنۡفُسَکُمۡ فَتَابَ عَلَیۡکُمۡ و عَفَا عَنۡکُمۡ فَالۡـٰٔنَ بَاشِرُوۡهُنَّ وَ ابۡتَغُوۡا مَا کتَبَ الله لَکُمۡ وَ کُلُوا وَ اشۡرَبُوا حَتّٰی یَتَبَیَّنَ لَکُمُ الۡخَیۡطُ الۡاَبۡیَضُ مِنَ الۡخَیطِ الۡاَسوَدِ مِنَ الفَجرِ ثُمَّ اَتِمُّوا الصِیَامَ اِلَی الَّیلِ و لَا تُبَاشِرُوۡهُنَّ وَ اَنۡتُمۡ عٰکِفُوۡنَ فِی الۡمَسٰجِدِ تِلکَ حُدُودُ اللهِ فَلَا تَقرَبُوۡهَا کَذلِکَ یُبَیِّنُ اللّٰهُ ایتِه لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمۡ یَتَّقُونَ

রোজার রাতে তোমাদের স্ত্রীদের নিকট যাওয়া তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে, তারা তোমাদের জন্য পোষাকসরূপ ও তোমরা তাদের জন্য পোষাকসরূপ। আল্লাহ জানে যে, তোমরা নিজদের সাথে অন্যায় করছিলে। এরপর তিনি তোমাদের তাওবা কবুল করেছেন, আর তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুতরাং, এখন তোমরা তাদের কাছে যাও আর আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা অনুসন্ধান কর। আর তোমরা পানাহার করতে থাকো যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। এরপর রাত হওয়া পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করো। আর তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে সহবাস করো না। এটা আল্লাহর সীমানা, সুতরাং তোমরা তার (স্ত্রীদের) নিকটবর্তী হয়ো না। এভাবেই আল্লাহ তাঁর আয়াতসমূহ মানুষের জন্য স্পষ্ট করেন যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।  (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৭)

যাকাত সম্পর্কিত আয়াত

এ নির্দেশনার কারণ হলো- যারা আল্লাহ তাআলার হুকুম মেনে হালাল কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারে, নিঃসন্দেহে তারা দুনিয়ার সব হারাম-অহেতুক কাজ থেকেও নিজেদের বিরত রাখতে সক্ষম।

রোজায় স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশা

রোজার বিধান আসার পর প্রথম প্রথম স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশা হারাম ছিল। এরপর ইফতারের পর থেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত স্ত্রী সহবাস করাকে অনুমতি দেওয়া হয়। একবার শয্যাগ্রহণ করে ঘুমিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই এ সবকিছু (খাবার গ্রহণ ও স্ত্রী সহবাস) হারাম হয়ে যেতো। এতে কোনো কোনো সাহাবি এ ব্যাপারে অসুবিধায় পড়েন। তখন এই আয়াত বিধান আসে ‘সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীদের নিকট গমন হালাল করা হয়েছে।’

রোজায় খাওয়া ও পান করা

রমজান মাসে নির্ধারিত একটি সময় খাওয়া ও পান করা নিষেধ। ভোর রাত থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যে কোনো হালাল খাবার ও পানীয় গ্রহণ করা যাবে এটি আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ کُلُوۡا وَ اشۡرَبُوۡا حَتّٰی یَتَبَیَّنَ لَکُمُ الۡخَیۡطُ الۡاَبۡیَضُ مِنَ الۡخَیۡطِ الۡاَسۡوَدِ مِنَ الۡفَجۡرِ۪ ثُمَّ اَتِمُّوا الصِّیَامَ اِلَی الَّیۡلِ

অতএব আহার করো ও পান করো যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কাল রেখা থেকে স্পষ্ট হয়। এরপর রাত পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো।'(সুরা বাকারা : ১৮৭)

এ মানে হলো, রাতে খাবার ও পানীয় গ্রহণ করা যাবে কিন্তু ভোর রাত থেকে সূর্যান্ত পর্যন্ত অর্থাৎ সারাদিন খাবার ও পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে রোজা পূর্ণ করতে হবে। আর এটিই মহান প্রভুর নির্দেশ।

রোজা সম্পর্কে কুরআনের আয়াত থেকে শিক্ষা

রোজা মানুষকে সময়ের সঠিক ব্যবহার শেখায়। রোজার প্রতিটি ইবাদতই সময়ের সঙ্গে জড়িত। যার কারণে মানুষ নিয়ম-শৃঙ্খলায় থাকতে অভ্যস্ত হয়, রোজা মানুষের মধ্যে আল্লাহর নির্দেশ পালনের মন-মানসিকতা তৈরি করে দেয়। রোজা নফসের দাসত্ব ও পাপ কাজ করা থেকে মানুষকে দূরে রাখে।

রমজান ঐক্যের শিক্ষা দেয়। দুনিয়ার সকল মুসলমানকে এক কাতারে সামিল করে দেয় রমজান, ধনি-গরিব কিংবা আমির-ফকিরে কোনো বৈষম্য থাকে না। কেননা ইফতার-সাহরি তারাবিতে কেউই নিজেদের মধ্যে উঁচু-নিচু ভাব নেয় না। করে না সময়ের ব্যবধান।

রমজান রোজা পালনের পাশাপাশি তারাবি ও তাহাজ্জুদ পড়া এবং ইতেকাফের মাধ্যমে মানুষকে মসজিদমুখী করে গড়ে তোলে, মসজিদ হয়ে ওঠে রোজাদারের আত্মার আস্তানা, হৃদয়ে কাবা, আর মসজিদমুখী পরিবেশের কারণে রোজাদারের মন্দ কাজের প্রতি আগ্রহ থাকে না বললেই চলে। যা রমজান পরবর্তী মাসগুলোতে চলতে থাকে।

অতএব, রোজার বিধান পালনের মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশ পালনে একনিষ্ঠ হয় রোজা পালনকারী। আর এভাবেই মানুষ মন্দ কাজ থেকে বিরত থেকে আল্লাহর ভয় অর্জনে উদ্বুদ্ধ হয়।

তাহলে রোজা সম্পর্কে কুরআনের আয়াত আরবি থেকে আমরা কি কি শিখলাম?

আল্লাহর অনুগ্রহ যে, তিনি তার বান্দাদের উপর বিভিন্ন সময় আদেশ-নিষেধ, উপদেশ দিয়েছেন। যার মাছে আছে ফরজ (আবশ্যকীয়) ও হারাম (বর্জনীয়) কাজ। তার মধ্যে একটি ফরজ হচ্ছে রমজান মাসের সিয়াম বা রোজা পালন করা। আল্লাহর হুকুমে দুনিয়া সব মন্দ থেকে নিজেদের বিরত রাখার মাধ্যমে তাকওয়া ও পরহেজগারি অর্জন করার জন্যই মুসলমান রোজা পালন করে ।

আল্লাহ তাআলা মানুষকে রোজা সম্পর্কে কুরআনের আয়াত আরবি জেনে রমজানের রোজা পালনের মাধ্যমে কুরআনের ঘোষণা তাকওয়া অর্জন করার তাওফিক দান করুন। দুনিয়া পরকালের যাবতীয় নেয়ামতে জীবন পরিপূর্ণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।